লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়ে হত্যা: স্বজনদের আহাজারিতে ভারী লটিয়া গ্রাম

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ছোট গ্রাম লটিয়ায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বাভাবিক কোলাহল আর কর্মব্যস্ততা হারিয়ে গ্রামটি এখন বিষণ্ণ। গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে খোঁড়া হয়েছে পাশাপাশি চারটি নতুন কবর। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া গ্রামের চারজন বাসিন্দার মরদেহ আসার প্রতীক্ষায় রয়েছেন গ্রামবাসী। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে লটিয়া গ্রামে এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা যায়।

নিহতরা হলেন গৃহবধূ শাহীনুর আক্তার (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) ও সিপা আক্তার (১০)। বৃহস্পতিবার রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার ভাড়া বাসায় তাঁরা খুন হন। পরিবারে এখন বেঁচে আছেন শাহীনুরের একমাত্র ছেলে ১৬ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত। ঘটনার সময় সে একটি দোকানে কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়।

শাহীনুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে স্বজনদের আহাজারি থামছে না। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন শাহীনুরের বৃদ্ধ মা হাজরা বেগম। পাশে বিলাপ করছিলেন শাহীনুরের শাশুড়ি শেফালুর নেছা, ননদ নুরজাহান ও সুফিয়া বেগম। শাশুড়ি শেফালুর নেছা শোকার্ত কণ্ঠে বলেন, একসঙ্গে চারজনকে হারানোর শোক সহ্য করা কঠিন। মা হাজরা বেগম জানান, ঈদের পর দুই দিন তাঁরা বাড়িতে এসেছিলেন, তখন কে জানত সেটিই হবে শেষ দেখা।

শাহীনুরের স্বামী কামাল হোসেন সাত বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর শাহীনুর চার সন্তানকে নিয়ে রায়পুরেই থেকে যান এবং গৃহকর্মীর কাজ ও আত্মীয়দের সহযোগিতায় সন্তানদের মানুষ করছিলেন। বড় মেয়ে সাইমা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায় ছিলেন, ইকরা এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ছোট সিপা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। সংসারের অভাব থাকলেও তিনি সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। একমাত্র জীবিত ছেলে সিফাত স্থানীয় এক রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ করে সংসার চালাতে সাহায্য করত।

শাহীনুরের ভাশুর আবদুল বাতেন জানান, সিফাত বাসায় থাকলে হয়তো সেও রক্ষা পেত না। তিনি পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন জানান, পরিবারটি অত্যন্ত সম্মান নিয়ে চলত, এমন বিপদে পুরো গ্রাম স্তম্ভিত। এলাকাবাসী সিফাতের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করার দাবি তোলেন।

স্বজনেরা জানিয়েছেন, রায়পুরে জানাজা শেষে মরদেহ গ্রামে আনা হবে এবং দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁদের পাশাপাশি দাফন করা হবে। গত বৃহস্পতিবারের ঘটনায় শাহীনুর ও সিপা ঘটনাস্থলেই মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর বড় মেয়ে সাইমা এবং ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথে ইকরার মৃত্যু হয়। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮), যিনি রায়পুরে ফল বিক্রি করতেন, স্থানীয়দের পিটুনিতে তিনিও হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। ঘটনার মূল কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।