ময়মনসিংহে গুদামে মজুত রেখেই কাগজপত্রে গম উত্তোলন: ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানে অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য
ময়মনসিংহ বিভাগের কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার (সিএসডি) থেকে কাগজপত্রে ৩৮০ টন গম উত্তোলন দেখানো হলেও এর একটি অংশ গুদামেই মজুত থাকার অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল রোববার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে নথিপত্রে কিছু অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জামিলুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গম বরাদ্দের বিস্তারিত
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুন জেলার তারাকান্দা উপজেলার কেন্দুয়া বাজার এলাকার মেসার্স তালুকদার ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে দুটি চিঠির মাধ্যমে মোট ৩৮০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই গম ভেঙে উৎপাদিত আটা জেলার নির্ধারিত এলএসডি (স্থানীয় সরবরাহ ডিপো) ও সিএসডিতে সরবরাহের নির্দেশ ছিল। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১১ জুনের মধ্যে গম উত্তোলন এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আটা সরবরাহের কথা ছিল।
অভিযোগ ও অভিযান
তবে অভিযোগ ওঠে যে, ১১ জুন কাগজপত্রে পুরো ৩৮০ টন গম উত্তোলন দেখানো হলেও বাস্তবে তা গুদাম থেকে বের হয়নি। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিকেলে সিএসডিতে অভিযান পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জামিলুর রহমান।
অভিযান চলাকালে গুদামে গিয়ে দেখা যায়, মালামাল লোড-আনলোড কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ৩০ নম্বর গুদামের সামনে পুলিশ মোতায়েন ছিল। সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, তালুকদার ফ্লাওয়ার মিলের নামে উত্তোলন দেখানো গমের একটি অংশ এখনো ওই গুদামেই রয়ে গেছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
৩০ নম্বর গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) জুনায়েদ ইবনে শফি জানান, বরাদ্দপত্রের মেয়াদ মাত্র এক দিন হওয়ায় কাগজপত্রে গম উত্তোলন দেখাতে হয়েছে। কাজের চাপ এবং সময়মতো পরিবহন না পাওয়ায় কিছু গম গুদামে রয়ে গেছে। বর্তমানে সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনিয়মের অভিযোগ ও সিএসডি ব্যবস্থাপকের অস্বীকার
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য বিভাগের এক কর্মচারী দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্রে গম উত্তোলন দেখিয়ে পরে তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ এতে জড়িত থাকায় অনিয়মগুলো ধরা পড়ে না।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিএসডির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ এরশাদুর রহমান খান। তিনি বলেন, ৩৮০ টনের ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) গত বৃহস্পতিবার হাতে পাওয়ার পর স্বল্প সময়ের কারণে পুরো গম সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। এখনো প্রায় ৯৪ টন গম উত্তোলন বাকি আছে এবং সরবরাহ কার্যক্রম চলমান। তিনি এতে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন। এরশাদুর রহমান আরও বলেন, “এক দিনে ১৮০ টন গম বিতরণ করা সম্ভব নয়। আমাদের নথিপত্রে সব ঠিক আছে। কাজের চাপের কারণে বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটও মূলত গম এখনো সরবরাহ না হওয়ার বিষয়টি দেখতে এসেছিলেন।”
ফ্লাওয়ার মিল মালিকের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
অন্যদিকে, মেসার্স তালুকদার ফ্লাওয়ার মিলের মালিক মোশাররফ হোসেন তালুকদার প্রথমে পুরো ৩৮০ টন গম বুঝে পাওয়ার কথা বললেও পরে জানান, কিছু গম এখনো পাওনা আছে। ঠিক কতটুকু গম উত্তোলিত হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
ম্যাজিস্ট্রেটের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ
সন্ধ্যা সোয়া সাতটা পর্যন্ত সিএসডি ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে নথিপত্র যাচাই-বাছাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা মজুত ও নথিপত্র যাচাই করেছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিখিত বক্তব্য নিয়েছি। রেজিস্টারে কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে।” তবে অনিয়মের প্রকৃতি বা পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
