বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আজ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ এশিয়ার শক্তিশালী দল জাপান। ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহ্যবাহী রোজ বোল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় শুরু হবে জাপান-ব্রাজিল ম্যাচটি। নকআউট পর্বে কোনো ভুল করার সুযোগ নেই, তাই বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ঝুঁকি এড়াতে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার দলের সম্ভাব্য সেরা একাদশ নিয়েই মাঠে নামতে যাচ্ছেন। যদিও পরিসংখ্যান, র্যাঙ্কিং ও অতীতের সব রেকর্ড ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলছে, তবুও সবশেষ ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়ের স্মৃতি জাপানকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখছে। এই নকআউট ম্যাচে বেশ কয়েকটি কারণে জাপান ব্রাজিলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমত, কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর ‘জায়ান্ট কিলিং’ ট্যাকটিক্স ও কাউন্টার অ্যাটাক। বর্তমানে জাপান যে পরিকল্পনা নিয়ে খেলছে তার মাস্টারমাইন্ড হলেন হাজিমে মোরিয়াসু। এই কৌশল অনুযায়ী, দল কম বল পজেশন রেখে দ্রুততম সময়ে প্রতিপক্ষের বক্সে বল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে। পরিসংখ্যান বলছে, এই পরিকল্পনায় জাপান অত্যন্ত সফল। সর্বশেষ বিশ্বকাপে জার্মানি এবং স্পেনকে হারানোর ম্যাচে জাপানের বল পজেশন ছিল যথাক্রমে মাত্র ২৬% এবং ১৮%। বল পায়ে কম রাখা সত্ত্বেও নিখুঁত ডিফেন্সিভ ব্লক এবং উইং-স্পিড ব্যবহার করে ম্যাচের ভাগ্য কীভাবে বদলে দিতে হয়, তা মোরিয়াসু একাধিকবার প্রমাণ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান জাপানি স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা। একসময় জাপানের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ঘরোয়া জে-লিগে খেলতেন, তবে বর্তমান দলটির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখনকার স্কোয়াডের প্রায় ৮০ শতাংশ খেলোয়াড়ই ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগে খেলছেন এবং নিয়মিত ভালো পারফর্ম করছেন। রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে লা লিগা কাঁপাচ্ছেন তাকেফুসা কুবো, মোনাকোর হয়ে লিগ ওয়ানে দারুণ ফর্মে আছেন তাকুমি মিনামিনো এবং স্টুটগার্টের উইঙ্গার হিসেবে খেলেন রিতসু দোয়ান। ইউরোপের সেরা টুর্নামেন্টগুলোতে খেলার কারণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের শক্তির জায়গা ও দুর্বলতাগুলো তাদের অজানা নয়।
তৃতীয়ত, জাপানের মাঝমাঠের দুই স্তম্ভ ওাতারু এনদো এবং আও তানাকার নিরবচ্ছিন্ন প্রেসিং। লিভারপুলের অভিজ্ঞ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এনদো এবং ডুসেলডর্ফের আও তানাকা দলটির প্রাণশক্তি। ফিফার ট্র্যাকিং ডাটা অনুযায়ী, এই দুই মিডফিল্ডার আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে প্রায় ১১.৮ কিলোমিটার দৌড়ান। ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত তাদের এই হাই-ইনটেনসিটি প্রেসিং ব্রাজিলের মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের খুব একটা সময় দেবে না। মাঝমাঠের এই নিরবচ্ছিন্ন চাপ ব্রাজিলের বিল্ড-আপ প্লে-কে শুরুতেই বড় কোনো ভুলের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
চতুর্থত, সেট-পিস ও এরিয়াল বলে জাপানের নিখুঁত রেকর্ড। আধুনিক ফুটবলে সেট-পিস অনেক ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। পরিসংখ্যান বলছে, জাপান তাদের শেষ ১০টি আন্তর্জাতিক গোলের ৩১% পেয়েছে কর্নার, ফ্রি-কিক কিংবা ডেড-বল পরিস্থিতি থেকে। বিশেষ করে জুনিয়া ইতো এবং তাকেফুসা কুবোর বাঁকানো ক্রস এবং বক্সে কো ইতাকুরা বা হিরোকি ইতোদের মতো দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের এরিয়াল হেড নেওয়ার ক্ষমতা দুর্দান্ত। অন্যদিকে, ব্রাজিলের রক্ষণভাগের সাম্প্রতিক অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো সেট-পিস এবং ক্রস থেকে গোল হজম করা। রোজ বোলের বড় মাঠে এই সেট-পিস আজকের ম্যাচে মোরিয়াসুর দলের জন্য বড় অস্ত্র হতে পারে।
পঞ্চমত, কোনো তারকা-নির্ভরতা নয়, বরং ‘কালেক্টিভ ফুটবল’ বা দলগত শক্তি। জাপানের মূল শক্তি হলো তাদের সমন্বিত দলগত পারফরম্যান্স। গত এক বছরে জাপানের গোল স্কোরের খাতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের কোনো নির্দিষ্ট এক বা দুইজন স্ট্রাইকারের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ডিফেন্ডার থেকে শুরু করে বদলি হিসেবে নামা উইঙ্গার—সবাই নিয়মিত গোল করছেন। স্কোয়াডে কোনো একক মেগা-স্টার না থাকায় ব্রাজিলের জন্য জাপানের কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে ম্যান-মার্ক করার কৌশল খুব একটা কার্যকর হবে না।
