ক্রোয়েশিয়ার নতুন কান্ডারি পেতার সুচিচের স্বপ্নযাত্রার গল্প

গোল করে নয়, সময়কে নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের ভাষা, ছন্দ তৈরিতে ক্রোয়েশিয়ার নতুন প্রজন্মের এক নাম পেতার সুচিচ। এই তরুণ মিডফিল্ডারকে দেখে মনে হয়, বল নিয়ে দৌড়ান না বরং বলকে পথ দেখান। খেলায় নেই অযথা তাড়াহুড়ো, নেই বাড়তি নাটক। আছে হিসাব, ধৈর্য, দূরদৃষ্টি আর সঠিক মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।

২০০৩ সালের ২৫ অক্টোবর, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ছোট্ট শহর লিভনোতে জন্ম পেতার সুচিচের। জন্মভূমি ছিল এক, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে বয়ে চলা পরিচয় ছিল আরেক। ক্রোয়েশিয়ান পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখেছিলেন ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, এটা স্বপ্ন আর নিজেকে তৈরি করার এক দীর্ঘ যাত্রা। শৈশবের পথটা খুব বড় আলোয় ভরা ছিল না। এনকে স্পোর্ট প্রিভেন্ট, ইসক্রা বুগইনো, তারপর জ্রিনস্কি মোস্তারের বয়সভিত্তিক কাঠামোর একটি একটি ধাপ পেরিয়ে তিনি নিজেকে গড়েছেন। ইউরোপের বড় মঞ্চে ওঠার আগে তিনি শিখেছেন অপেক্ষা কী, সুযোগের মূল্য কত, আর প্রতিটি ম্যাচ কেন পরবর্তী দরজার চাবি।

২০২২ সালে আসে বড় মোড়। ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব দিনামো জাগরেব তাকে দলে নেয়। অনেক তরুণ ফুটবলারের মতো তাকেও প্রথমে ফিরে যেতে হয়েছিল ধার হিসেবে, আবার জ্রিনস্কিতে। অনেকের কাছে যা পিছিয়ে যাওয়া, সুচিচ সেটাকেই বানালেন এগিয়ে যাওয়ার পথ। সেই সময়টাতে তিনি শুধু খেলেননি, নিজেকে প্রমাণ করেছেন। দলকে লিগ ও কাপ জিততে সাহায্য করেছেন। মাঠে দেখিয়েছেন, শুধু প্রতিভাবান নন, তিনি দায়িত্ব নিতে জানেন। দিনামোতে ফিরে এসে তার খেলার ধরন বদলে যায়। মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সংযোগের কেন্দ্র। রক্ষণ থেকে আক্রমণ, গতি থেকে নিয়ন্ত্রণ সব জায়গায় তার ছাপ পড়তে শুরু করে। দেশীয় সাফল্যের পাশাপাশি ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাব প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও তিনি নজর কাড়েন। তার পাসিং রেঞ্জ, খেলা পড়ার ক্ষমতা, চাপের মধ্যেও শান্ত থাকার গুণ ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে।

২০২৫ সালে আসে নতুন অধ্যায়। ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইন্টার তাকে নিজেদের ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে বেছে নেয়। ইন্টারে যোগ দেওয়া শুধু ক্লাব বদল নয়, এটি ছিল একটি আগমনী বার্তা। ইউরোপ বিশ্বাস করছে, ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের পরবর্তী বড় নামদের একজন হতে পারেন পেতার সুচিচ। তার খেলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো বহুমুখিতা। তিনি স্বাভাবিকভাবে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, তবে প্রয়োজন হলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডেও খেলতে পারেন। প্রতিপক্ষের চাপ ভাঙতে পারেন, আবার আক্রমণে উঠে গিয়ে সুযোগও তৈরি করেন। এমন একজন খেলোয়াড়, যে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

জন্ম যদিও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায়, তবু তিনি বেছে নিয়েছেন ক্রোয়েশিয়াকে। সেখানে আছে তার শিকড়, পরিবার ও অনুভব। ২০২৪ সালে জাতীয় দলে তার অভিষেক হয়। উয়েফা নেশনস লিগে গোল করে তিনি জানান দেন, শুধু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নন, বর্তমানেরও অংশ তিনি। ক্রোয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকে মাঝমাঠের শিল্পী উপহার দিয়েছে, সেই ধারায় নতুন এক নাম এখন উঠে আসছে। পেতার সুচিচের সামনে এখন অনেক পথ ও পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। এই ছেলেটি শুধু ম্যাচ খেলতে আসেননি, নিজের সময় তৈরি করতে এসেছেন। ফুটবলের ইতিহাসে কিছু মানুষ আলোয় দাঁড়িয়ে কিংবদন্তি হন, আর কিছু মানুষ ছায়া থেকে উঠে এসে আলোকেই নতুন অর্থ দেন। পেতার সুচিচ সেই আলোরই নতুন এক অধ্যায়।