২০২৬ বিশ্বকাপে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি বা পানি পানের বিরতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে ম্যাচের গতি বা মোমেন্টাম অনেক সময় ফল নির্ধারণ করে দেয়। কোনো দলই সাধারণত ৯০ মিনিট পুরোপুরি আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। তাই যে সময় একটি দল প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে গোল করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই বিরতিগুলো ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছে বলে অনেকে মনে করছেন। বিশেষ করে তুলনামূলক দুর্বল এবং আরব দলগুলোর ভালো পারফরম্যান্সে এই নিয়মের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফিফা বিশ্বকাপের শুরুর আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, প্রচণ্ড গরম থেকে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচের প্রতিটিতেই প্রথমার্ধের ২২তম এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭তম মিনিটে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি থাকবে। আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও ভ্যাঙ্কুভারের মতো ইনডোর স্টেডিয়ামেও এই নিয়মটি কার্যকর করা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটি খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে কোচরা এই সময়টিকে কৌশল বদল এবং ম্যাচের মোমেন্টাম নিজেদের দিকে ফেরানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
বেশিরভাগ বিরতিতেই খেলোয়াড়দের পানি পানের পাশাপাশি কোচদের কাছ থেকে নতুন কৌশলগত নির্দেশনা নিতে দেখা গেছে। যেমন কুরাসাও ও জার্মানির ম্যাচে দেখা যায়, কুরাসাও সমতা ফেরানোর পরপরই বিরতি আসে এবং বিরতির পর জার্মানি দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়া উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের বিরতির পরই খেলার মোমেন্টাম বদলে যায়, যেখানে উরুগুয়ে ৮০তম মিনিটে সমতা ফেরাতে সক্ষম হয়। জর্ডান ও মরক্কোর ক্ষেত্রেও বিরতির পর ম্যাচের চিত্র বদলে যাওয়ার উদাহরণ লক্ষ্য করা গেছে।
এই বিরতি নিয়ে দর্শকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা গেছে এবং অনেক স্টেডিয়ামে রেফারি খেলা থামানোর সময় দর্শকদের দুয়োধ্বনি শোনা গেছে। সমালোচকদের দাবি, অতিরিক্ত গরমের অজুহাতে ফিফা মূলত বাণিজ্যিক আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। যদিও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন যে, এই বিরতি থেকে সংস্থাটি কোনো অর্থ আয় করে না, তবে বিরতিগুলো ‘Hydration Break brought to you by Powerade’ নামে স্পন্সর করা হওয়ায় এর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলও এই নিয়ম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তিনি বলেন, এই বিরতি ফুটবলের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দিচ্ছে এবং ম্যাচকে চারটি আলাদা ভাগে ভাগ করে ফেলছে। যদিও তিনি বিরতিগুলোকে নিজের দলের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন, তবে তিনি খোলাখুলিই জানিয়েছেন যে, নিয়মটি তার পছন্দ নয়। দ্বিতীয় হাইড্রেশন বিরতির পর তিনি ডেকলান রাইসকে রাইট-ব্যাকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই পরিবর্তনের সুফলও দ্রুত মেলে। হ্যারি কেন ৭৫ ও ৮৬ মিনিটে দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেন।
দ্য টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন বিরতির পরই ম্যাচের সবচেয়ে বড় মোমেন্টাম পরিবর্তন ঘটে। বিরতির পর উরুগুয়ে ৮০তম মিনিটে সমতা ফেরায়। সৌদি আরব যদি ১-০ ব্যবধান ধরে রাখতে পারত, তাহলে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পুনরায় মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেতে পারত।
অন্যদিকে ব্রাজিলের বিপক্ষে মরক্কোও প্রথমার্ধে দারুণ খেলছিল। কিন্তু হাইড্রেশন বিরতির পর ব্রাজিল নিজেদের কৌশল পুনর্গঠন করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সমতা ফেরায়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়।

