ইরানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৪ জন নিহত, আহত ৫

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহরের কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, শুক্রবার (২৪ জুলাই) ভোরে এই হামলা চালানো হয়। খুজেস্তান প্রদেশের স্থানীয় কর্মকর্তারাও এই হামলা ও হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতদের পরিচয় এবং হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আহভাজ ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রদেশটি তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সর্বশেষ হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ড্রোন সংরক্ষণাগার, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং সামুদ্রিক সক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব হামলার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক ও নৌ সক্ষমতার কিছু অংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর, চাবাহার, জাস্ক, কোনারাক, আবু মুসা ও বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল। মার্কিন সেন্টকমের দাবি, এসব অভিযানে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং সামুদ্রিক সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও বলছে, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক সহায়তায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি করে আসছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথকে ঘিরে সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসেও নতুন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, শহরের তাপেহ আল্লাহু-আকবার আবাসিক এলাকায় হামলায় অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন। বন্দর আব্বাস হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত এবং ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকাগুলো বারবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর আগে বন্দর আব্বাস ও আশপাশের এলাকায় হামলার পাশাপাশি কিশ ও কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণ ও সামরিক তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের সামরিক স্থাপনা ও সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করেই এসব অভিযান চালানো হচ্ছে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতেও আহভাজের উপকণ্ঠে মার্কিন হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়। ৯ জুলাই তাসনিমের এক প্রতিবেদনে খুজেস্তান প্রদেশের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, আহভাজের কাছে মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। নতুন হামলার ঘটনায় ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিচালিত হওয়ায় সংঘাতের বিস্তার আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ, জ্বালানির দাম এবং বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলা এবং পাল্টা সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানের দক্ষিণাঞ্চল, হরমুজ প্রণালি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোকে ঘিরে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। নতুন হামলায় হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।