বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখন আকাশছোঁয়া, যার ফলে অনেক পরিবার আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবারগুলো বাদ দিচ্ছেন। পেট ভরানোর জন্য মানুষ এখন কমদামি খাবারের দিকে ঝুঁকছে, যার ফলে পরিবারগুলোতে নীরবে চরম অপুষ্টির সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। পুষ্টির চাহিদা মেটাতে তিন সদস্যের একটি পরিবারের জন্য মাসে অন্তত সাড়ে সাত হাজার থেকে সাড়ে দশ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়, কিন্তু আয়ের সিংহভাগই বাসাভাড়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় হয়ে যায়।
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার। এছাড়া দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যা শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অপুষ্টির কারণে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং ৩ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছে। বর্তমানে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার শিশু খর্বকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার। এই সংকট গ্রামীণ ও শহরতলির নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের গর্ভজাত শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপরও।
বর্তমান বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিন সদস্যের একটি পরিবারের আমিষের চাহিদা মেটাতে তিনটি ডিমের পেছনেই খরচ হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। ছোট মাছ, ব্রয়লার মুরগি বা ডালের পেছনে ব্যয় হচ্ছে ৪০ থেকে ৮০ টাকা। ভিটামিন ও খনিজের জন্য আধা কেজি সবজি কিনতে খরচ হচ্ছে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা। এছাড়া শর্করা ও চর্বির চাহিদা মেটাতে চাল বা আটার পেছনে দিনে খরচ হয় ৬৫ থেকে ৮৫ টাকা এবং তেল, পেঁয়াজ ও লবণের পেছনে ব্যয় হচ্ছে ৪৫ থেকে ৬৫ টাকা। সব মিলিয়ে একটি পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা শারমিন আক্তার ও ফয়সাল হোসেন দম্পতি জানান, গার্মেন্টসে চাকরি করে মাসে ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি আয় করেন তারা। বাসাভাড়া ১২ হাজার, ইউটিলিটি বিল ৪ হাজার এবং দুই সন্তানের পড়াশোনায় ৭ হাজার টাকা চলে যাওয়ার পর বাকি টাকা দিয়ে চারজনের খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই অবস্থা মিরপুরের মার্কেটিং কর্মী রাজ্জাক হোসেনের। ২০ হাজার টাকা আয়ের মধ্যে ১০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে নিজের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে তিনি ভালো কিছু খাওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। সাভারের গার্মেন্টস কর্মী মেহেদী হাসান জানান, মাসে ১৩-১৪ হাজার টাকা আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়া ও বাড়িতে পাঠানোর পর তার কাছে বাড়তি মাত্র ১০০০-১৫০০ টাকা থাকে, যা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার কেনা সম্ভব নয়। গৃহকর্মী নূর নাহার বেগম জানান, স্বামী-স্ত্রী মিলে ২৫ হাজার টাকা আয় করলেও সংসার চালাতে গিয়ে পুষ্টিকর খাবার কেনা এখন তাদের জন্য অসম্ভব।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোমিনুর রহমান বলেন, মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারে পুষ্টিহীনতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার বড় উদাহরণ হিসেবে হামের প্রকোপ বাড়ছে। আর্থিক সংকটের কারণে মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে না, পাশাপাশি খাদ্য সচেতনতার অভাবও রয়েছে। তিনি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ঢাকায় আকাশচুম্বী বাসাভাড়ার লাগাম টানার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী জানান, আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি সচেতনতার অভাব ও খাদ্যে ভেজালের কারণেও অপুষ্টি বাড়ছে। তিনি বলেন, কম দামি কিন্তু অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অপুষ্টির হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

