পাকিস্তানকে একঘরে করার ভারতীয় কৌশল ব্যর্থ, বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী অবস্থানে ইসলামাবাদ

বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে বা বিচ্ছিন্ন করার যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গ্রহণ করেছিলেন, তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তান এখন আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পরাশক্তি চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতির কারণে পাকিস্তান এখন বিশ্ব কূটনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ ২০১৬ সালে ভারতের কেরালার এক জনসভায় নরেন্দ্র মোদি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, “পাকিস্তানকে বিশ্বজুড়ে একঘরে করতে আমরা সব ধরনের প্রচেষ্টা জোরদার করব।”

কিন্তু এক দশক পর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। থিংক ট্যাংক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আল জাজিরাকে বলেন, “আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানকে কোনঠাসা করার ভারতের কৌশলটি বড় আকারে ব্যর্থ (ব্যাকফায়ার) হয়েছে।”

নেপথ্যে ২০২৫ সালের আকাশযুদ্ধ ও ট্রাম্পের মধ্যস্থতা

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে কাশ্মীর সীমান্ত নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক সংঘাত বেঁধেছিল। সে সময় পাকিস্তানের আকাশসীমায় ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় চার দিনের সেই যুদ্ধ থামলেও, এটি বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করে।

পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দেয় এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। এর ফলে ট্রাম্পের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান—যা কোনো পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের জন্য বিরল সম্মান। ট্রাম্প জেনারেল মুনিরকে তার “প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” এবং একজন “ব্যতিক্রমী মানুষ” হিসেবেও অভিহিত করেন।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ধাক্কা

পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে ভারত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-কে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ২০১৬ সালের পর ভারতের আপত্তিতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আর অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে এতে পাকিস্তানের ক্ষতি না হয়ে উল্টো ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব পড়েছে।

বিশেষ করে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে চীনের সাথে পাকিস্তানের “লৌহ কঠিন” কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই বেইজিং সফরে যাওয়া পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সম্পর্কের প্রশংসা করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদি সরকারের “সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না” নীতি এবং জোরপূর্বক প্রতিবেশীকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা ভারতের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থানকেই কিছুটা জটিল করে তুলেছে।