ফুটবল কেবল একটি সাধারণ খেলা নয়, এটি একটি সংস্কৃতি, আবেগ এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়। খুব কম দেশই আছে যাদের নাম শুনলে চোখের সামনে ফুটবলের একটি বিশেষ চিত্র ভেসে ওঠে। ব্রাজিল যেন সেই তালিকার ব্যতিক্রমী এক নাম। ব্রাজিল মানেই ছিল বলের সঙ্গে গভীর প্রেম, সবুজ ঘাসে শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো নিখুঁত পাস, বিপক্ষকে ঘোল খাওয়ানো ড্রিবল এবং গোলের পর ছন্দময় নৃত্য। বিশ্ব ফুটবল বহু কিংবদন্তি ও শক্তিশালী দলের সাক্ষী হয়েছে, কিন্তু ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দক্ষতা সবচেয়ে ভালো আয়ত্ত করেছিল সেলেসাওরাই।
সময়ের পরিবর্তনে সবকিছুর মতোই ব্রাজিলও বদলেছে। গত কয়েক বছরে দলটি নিয়মিত জয় পেয়েছে এবং শিরোপার লড়াইয়ে টিকে থেকেছে, কিন্তু তাদের খেলায় সেই পুরোনো শিহরণ হারিয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছে, মাঠে ফলাফল থাকলেও সেখানে কোনো গল্প নেই, জয়ের মাঝেও জাদুর অভাব। যেন সাম্বার সুর কোনো ব্যস্ত শহরের ভিড়ে ঢাকা পড়েছে। বিশ্বকাপের শুরুতে সেই সংশয় আরও গভীর হয়েছিল। মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দেখে মনে হয়নি তারা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। পাসের অভাব এবং বিচ্ছিন্ন আক্রমণের ফলে দলটিকে লক্ষ্যহীন মনে হচ্ছিল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একক ঝলক না থাকলে সেই ম্যাচের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।
পরবর্তীতে হাইতির বিপক্ষে জয় এলেও তা আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ছিল না। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের জেগে ওঠার এক মাইলফলক। এটি কেবল তিন পয়েন্ট পাওয়ার গল্প নয়, বরং দলের ছন্দে ফেরার সংকেত। দীর্ঘদিন পর ব্রাজিলকে বলের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে। তারা আক্রমণ করেছে উপভোগের মানসিকতা নিয়ে এবং মাঝমাঠ থেকে উইং পর্যন্ত ছিল দারুণ ছন্দ। এই পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তার ফুটবলে যে নির্ভীক সৌন্দর্য রয়েছে, তা আধুনিক ফুটবল কৌশলের মাঝেও পুরোনো ব্রাজিলীয় আমেজ ফিরিয়ে আনে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার জোড়া গোল ও উপস্থিতিতে দর্শক মুগ্ধ হয়েছে।
কার্লো আনচেলত্তির কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি কি দলকে কেবল কার্যকরী বানাবেন নাকি ব্রাজিলীয় ফুটবল সত্তা ফিরিয়ে দেবেন। তিনি সম্ভবত ধাপে ধাপে কাজ করছেন, যেখানে শুরুতে জয়ে গুরুত্ব দিয়ে পরে শৈল্পিক স্বাধীনতার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এর মাঝে বড় সুখবর হলো নেইমারের প্রত্যাবর্তন। নেইমার এখনও এই প্রজন্মের সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্রাজিলীয় ফুটবলার। তার খেলায় ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ও মাঠের আনন্দ বজায় আছে। ভিনিসিয়ুস ও নেইমার যদি নিজেদের ছন্দে থাকেন, তবে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে এক নতুন মাত্রা যোগ হবে।
অবশ্যই একটি বা দুটি ম্যাচ দেখে অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ সামনে নকআউট পর্বের কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। সেখানে ভুলের মূল্য অনেক বেশি। তবুও ভক্তরা আশাবাদী, কারণ ব্রাজিলকে এখন কিছুটা হলেও নিজের মতো দেখাচ্ছে। যদিও তারা পূর্ণতা পায়নি, তবুও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দলটি নিজেদের হারানো আয়নাটি খুঁজে পেয়েছে। সেই আয়নায় প্রতিচ্ছবি এখনও অস্পষ্ট হতে পারে, কিন্তু দূর থেকে সাম্বার সুর ভেসে আসা শুরু হয়েছে। আর বিশ্ব জানে, ব্রাজিল যখন ছন্দে ফেরে, তখন পুরো বিশ্বকাপই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
