তাকলামাকান মরুভূমিতে নকল যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান বানিয়ে চীনের যুদ্ধের প্রস্তুতি

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা সেনাবাহিনী তাদের দেশের প্রত্যন্ত তাকলামাকান মরুভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, নৌঘাঁটি এবং তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের হুবহু প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা তৈরি করেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব কৃত্রিম স্থাপনা ব্যবহার করে চীন তাইওয়ান দখল এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আরলি বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজের একটি ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তা প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়। সমুদ্র থেকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরের মরুভূমিতে নির্মিত এই যুদ্ধজাহাজটি চলাচলের জন্য নয়, বরং বাস্তবসম্মত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অনুশীলনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে মূল জাহাজের মতো মাস্ট ও রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মহড়া আরও নিখুঁত করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রশিক্ষণ এলাকায় কেবল যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং মার্কিন যুদ্ধবিমান, জাপানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটি এবং তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার প্রতিরূপও তৈরি করা হয়েছে। এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান দ্য ইন্টেল ল্যাবের ভূ-গোয়েন্দা গবেষক ড্যামিয়েন সাইমন জানিয়েছেন, এসব প্রতিরূপের নিখুঁততা প্রমাণ করে যে চীন সাধারণ সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা শি জিনপিংয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এবং এই উদ্দেশ্য পূরণে চীন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর অস্ত্রব্যবস্থার সক্ষমতা পরীক্ষা করছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান জেনসের প্রধান স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষক শন ও’কনর জানান, তারা তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরূপ তৈরি করেছে যাতে সেনারা রাজধানী তাইপের রাস্তায় অভিযানের মতো পরিবেশে অনুশীলন করতে পারে। গত বছরের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, তাইওয়ানের সরকারি ভবনের প্রতিরূপগুলোর মধ্যে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেল তৈরি করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাইওয়ানের নেতারা ভূগর্ভস্থ পথে পালানোর চেষ্টা করলে সেই পরিস্থিতির অনুশীলনের জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল মন্টি খান্না চীনের এই প্রস্তুতির পরিসরকে “অভূতপূর্ব” বলে বর্ণনা করেছেন।

মরুভূমির বিশাল প্রশিক্ষণ এলাকায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের ওপর বসিয়ে নকল যুদ্ধজাহাজ টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, যা সমুদ্রে চলমান জাহাজে আঘাত হানার পরিস্থিতি তৈরি করে। এর মাধ্যমে চীন তাদের জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। ২০২১ সালের অক্টোবরে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে একটি লক্ষ্যবস্তু প্রায় অক্ষত অবস্থায় দেখা গেলেও সর্বশেষ ছবিতে সেটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেখা গেছে। এছাড়া সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড বিমানবাহী রণতরীর অন্তত দুটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরূপ, আরলি বার্ক-ক্লাস ডেস্ট্রয়ারের দুটি সমতল নকশা এবং এফ-২২, এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রতিরূপও রয়েছে। একটি রানওয়ের পাশে সাজানো এফ-২২ এর প্রতিরূপের মধ্যে অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটির প্রতিরূপও সেখানে দেখা গেছে, যেখানে বর্তমানে ৫৫ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তাইওয়ানের সাবেক নৌ কর্মকর্তা লু লি-শিহ বলেন, তাইওয়ান আক্রমণ হলে ইয়োকোসুকা ঘাঁটি অবশ্যই ব্যবহৃত হবে, তাই চীন সেখানে হামলার অনুশীলনের জন্য এই প্রতিরূপ তৈরি করেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে প্রতিরূপ ঘাঁটির পাশে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের গর্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজও দেখা গেছে। এছাড়া তাইওয়ানের সু’আও নৌঘাঁটির প্রতিরূপও নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়।

ড্যামিয়েন সাইমন বলেন, এসব নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনী নয়, বরং বহু কিলোমিটার দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে, যা চীনের বিশ্বাসযোগ্য দীর্ঘপাল্লার হামলা সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এসব প্রতিরূপে ওয়াইজে-২১, ওয়াইজে-১৭ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ডিএফ-২৭ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এছাড়া ২০০২ সালে নির্মিত তাইওয়ানের বিমানঘাঁটির একটি প্রতিরূপও সেখানে রয়েছে, যা চীনের সবচেয়ে পুরোনো সামরিক অনুকরণগুলোর একটি।

চীন তাইপের বো’আই বিশেষ প্রশাসনিক এলাকার দুটি আলাদা প্রতিরূপ তৈরি করেছে। ২০১৪ সালে নির্মিত একটি প্রতিরূপ সরকারি ভবনগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি, যাতে স্থলবাহিনী রাজধানী দখলের অনুশীলন করতে পারে। অন্যটি ইনার মঙ্গোলিয়ার মরুভূমিতে নির্মিত, যেখানে তাইপের রাস্তা ও ব্লকের বিন্যাস হুবহু অনুসরণ করা হয়েছে। সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস শুগার্ট বলেন, এসব প্রতিরূপ জাপানকে বার্তা দিচ্ছে যে সংঘাত হলে তারাও এর অংশ হবে, যুক্তরাষ্ট্রকে বলছে হস্তক্ষেপ করলে ঘাঁটিতে হামলা হবে, আর তাইওয়ানকে দেখাচ্ছে রাজধানী দখলের অনুশীলন ইতোমধ্যে চলছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মে মাসে চীনের এই নজিরবিহীন সামরিক সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

অন্যটি ইনার মঙ্গোলিয়ার মরুভূমিতে নির্মিত হয়েছে, যেখানে তাইপের রাস্তা, মোড় এবং ব্লকের বিন্যাস হুবহু অনুসরণ করা হয়েছে।সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির (সিএনএএস) জ্যেষ্ঠ ফেলো ও সাবেক মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন কমান্ডার থমাস শুগার্ট বলেন, এসব প্রতিরূপ মূলত পূর্ণাঙ্গ অভিযানের মহড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, পিএলএ সদস্যরা প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রতিরূপের সামনে গুলি চালানো এবং ভবনটির দিকে অগ্রসর হওয়ার মহড়া দিচ্ছেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin