স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাপক জনপ্রত্যাশা নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। অধিকাংশ বাংলাদেশি এই পরিবর্তনকে দেশের রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। নাগরিকরা চেয়েছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের কর্মকাণ্ড এখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের মতে, নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কথা বলা হলেও সমালোচকরা মনে করেন, সরকার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, শাসনব্যবস্থা ক্রমশ অনির্বাচিত সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যাদের অনেকের বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে। এ ছাড়া একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ এবং স্বার্থান্বেষী মহল জবাবদিহিতা ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করেছে। সংস্কারের পরিবর্তে এই সরকার আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের গণগ্রেপ্তার ও দীর্ঘ আটকাদেশের মাধ্যমে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির পথে হেঁটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, তার বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণ নিয়েও জোরালো সমালোচনা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আমলাতন্ত্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। শাসনকাজ শক্তিশালী হওয়ার বদলে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সূচক বেড়েছে, যা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে, যদিও তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত। তবে সরকারি পদের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত, কর মামলা প্রত্যাহার এবং বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনার মুখ খোলা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মব কালচার বা গোষ্ঠীভিত্তিক কর্মকাণ্ডের ফলে আইনবহির্ভূত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি, শিল্পী ও লেখকদের মত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টাও চোখে পড়ার মতো ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত ও এনসিপি-র মতো দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি আটক ও বিচারহীনতার প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, যা নির্বাচিত বা অনির্বাচিত সব সরকারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শেষ পর্যন্ত সরকারের কাজের মাধ্যমেই তার মূল্যায়ন হবে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে সব প্রশাসনকেই একই জবাবদিহিতার মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।
