৫ আগস্ট ২০২৪: যেভাবে গণ-অভ্যুত্থানে পতন ঘটেছিল শেখ হাসিনার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির ক্যালেন্ডারে একটি অবিস্মরণীয় দিন, যা আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিত। এদিন একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের সফল সমাপ্তি ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার দীর্ঘ ক্ষমতার শাসনের পতন হয়। সেদিন সাধারণ ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। তার সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানাও দেশত্যাগ করেন। বর্তমানে তারা দিল্লিতে অবস্থান করছেন। এই অভূতপূর্ব ঘটনার মাধ্যমেই বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তৈরির পথ প্রশস্ত হয় এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসা ও সংবিধান সংশোধনসহ রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছে চব্বিশের ৫ আগস্ট।

দুই বছর আগের ওই দিনটির সকাল ছিল জুলাই আন্দোলনের অন্যান্য দিনের মতোই রক্তাক্ত ও আতঙ্কময়। সরকার কারফিউ ভেঙে জমায়েত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল এবং পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান সড়কে মোতায়েন ছিল। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে জীবনের মায়া ত্যাগ করে বিপ্লবী জনতা রাস্তায় নেমে আসেন। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও উত্তরার প্রবেশপথ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেন। বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে শুরু করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। একই সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন পয়েন্টে সংঘর্ষে অনেকেই নিহত হন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুহুর্মুহু গুলির মুখে ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড ভেঙে গণভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। দুপুর ১২টার দিকে গণভবনের নিরাপত্তা রক্ষায় থাকা সেনাসদস্যরা সরে যেতে শুরু করেন। এরপর আইএসপিআরের মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দুপুর ২টায় জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন বলে জানানো হয়, যা শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানোর ইঙ্গিত দেয়। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভারতের আগরতলার উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। একই সময়ে ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় ও সুধা সদন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরে যান।

বিকাল ৪টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানান। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ছাত্র-জনতা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও দিনমজুরসহ সর্বস্তরের মানুষ বিজয়ের আনন্দে শামিল হন। এদিকে হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তার মা পদত্যাগের বিষয়টি আগে থেকেই বিবেচনা করছিলেন এবং পরিবারের অনুরোধে নিরাপত্তার স্বার্থেই তিনি দেশত্যাগ করেছেন।

সরকারের পতনের খবর পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাস্তা থেকে সরে যান। এদিন হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে ঢুকে পড়েন। তারা সংসদ সদস্যদের চেয়ারে বসে ছবি তোলেন এবং গণভবনের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যান। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই তৎকালীন সরকার শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল এবং আন্দোলনকে বিরোধীদের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের মাধ্যমেই সফল গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। বর্তমানে জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত