বিশ্বকাপ ট্রফির অজানা ইতিহাস: সোনা, চুরি ও কোটি টাকার মূল্য

ফিফা বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসরই নয়, এর শিরোপা ও ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলো নিয়েও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। অনেকেই মনে করেন, এই ট্রফি বা চ্যাম্পিয়নদের পদক সম্পূর্ণ খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো এই ট্রফির ইতিহাস, এর নকশা, নির্মাণপ্রক্রিয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মূল্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর ধরনেও এসেছে পরিবর্তন।

বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস শুরু হয়েছিল 'জুলে রিমে ট্রফি' দিয়ে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলে বিজয়ী দলকে এই ট্রফি দেওয়া হয়। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছিল। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুরের নকশায় তৈরি এই ট্রফিতে বিজয়ের প্রতীক গ্রিক দেবী নাইকির ভাস্কর্য ছিল। এটি স্বর্ণমণ্ডিত রূপা দিয়ে তৈরি ছিল, যার উচ্চতা ছিল প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৩.৮ কেজি।

১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত এই ট্রফির একটি বিশেষ নিয়ম ছিল: কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে তাদের কাছে থাকবে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে জুলে রিমে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেয়। তবে, ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায় এবং আজও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তকারীদের ধারণা, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে।

জুলে রিমে ট্রফি ব্রাজিলের দখলে চলে যাওয়ার পর ফিফা নতুন ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের কাছ থেকে শতাধিক নকশা জমা পড়ে, যেখান থেকে ইতালির ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশাটি নির্বাচিত হয়। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে বর্তমান ট্রফিটি চালু হয়। এর প্রতীকী নকশায় পৃথিবীকে উপরে তুলে ধরা দুটি মানবাকৃতি রয়েছে, যা বিজয়, ঐক্য এবং বৈশ্বিক ফুটবলের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬.১৭৫ কেজি। এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি, যেখানে প্রায় ৫ কেজির মতো ১৮ ক্যারেট সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রফিটির নিচের অংশে সবুজ রঙের দুটি ম্যালাকাইট পাথরের স্তর এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তবে এটি সম্পূর্ণ কঠিন সোনার নয়; ভেতরের অংশ ফাঁপা রাখা হয়েছে। কারণ পুরো ট্রফি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি হলে এর ওজন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কেজি হতো, যা বহন করা প্রায় অসম্ভব।

ট্রফি তৈরির কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গোপনীয় প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। প্রথমে শিল্পীর নকশা অনুযায়ী মোমের আদলে একটি মডেল তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ ছাঁচে ধাতব কাঠামো ঢালাই করা হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে বাইরের অংশ তৈরি ও নিখুঁতভাবে পালিশ করা হয়। সবশেষে ট্রফির নিচে ম্যালাকাইট পাথর বসানো হয় এবং বিজয়ী দেশগুলোর নাম খোদাই করার জন্য নির্ধারিত স্থান রাখা হয়। প্রতিটি ধাপেই উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্বকাপ ট্রফির বাজারমূল্য শুধু ব্যবহৃত সোনার ওপর নির্ভর করে না, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রতীকী মর্যাদাও এর মূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু সোনার বাজারমূল্য হিসাব করলে ট্রফিটির মূল্য কয়েক লাখ মার্কিন ডলার হতে পারে। তবে ক্রীড়া ইতিহাসবিদ ও নিলাম বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কখনো এটি বৈধভাবে নিলামে তোলা হতো, তাহলে এর মূল্য দুই থেকে আড়াই কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি) ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে ফিফা কখনোই এই ট্রফি বিক্রি বা নিলামে তোলে না।

অনেকের ধারণা, বিশ্বকাপজয়ী দেশ আসল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে বিজয়ী দলের অধিনায়ক যে ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন, সেটিই আসল ট্রফি। তবে অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষে সেটি আবার ফিফার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিজয়ী দেশকে সংরক্ষণের জন্য আসল ট্রফির একটি অনুমোদিত স্বর্ণমণ্ডিত প্রতিরূপ দেওয়া হয়।

বিশ্বকাপের শুরুতে শুধু চ্যাম্পিয়ন ট্রফির ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হলেও, পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ব্যক্তিগত পুরস্কার যোগ হয়। দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণেরও স্বীকৃতি দেওয়া হয়। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় পান ‘গোল্ডেন বল’, সর্বোচ্চ গোলদাতার হাতে ওঠে ‘গোল্ডেন বুট’, আর সেরা গোলরক্ষককে দেওয়া হয় ‘গোল্ডেন গ্লাভস’। এ ছাড়া টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ফুটবলার পান ‘সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার’ এবং মাঠে শৃঙ্খলা ও খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দলকে দেওয়া হয় ‘ফেয়ার প্লে পুরস্কার’। এইসব পুরস্কারের নামে ‘গোল্ডেন’ থাকলেও, অধিকাংশই ব্রাস, ব্রোঞ্জ বা অন্য ধাতুর ওপর সোনার প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয়। চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়দের দেওয়া স্বর্ণপদকও সাধারণত রূপার ওপর সোনার প্রলেপযুক্ত।

বিশ্বকাপ ট্রফি পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত ক্রীড়া সামগ্রীর একটি। এটি বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবহনের সময়ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। ফিফার অনুমতি ছাড়া কেউ ট্রফি স্পর্শ করতে পারেন না। সাধারণত কেবল বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য, রাষ্ট্রপ্রধান বা ফিফার নির্ধারিত কর্মকর্তারাই এটি হাতে নেওয়ার সুযোগ পান। বিশ্বকাপ ট্রফির মূল্য শুধু সোনা বা ধাতুর দামে নির্ধারিত হয় না। এটি কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ, ইতিহাস এবং ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তাই এই ট্রফি হাতে তোলার মুহূর্তটি একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রফি, পদক ও ব্যক্তিগত পুরস্কারের পেছনের এই ইতিহাস ও নির্মাণপ্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়— এগুলো শুধু ধাতুর তৈরি বস্তু নয়; বরং বিশ্ব ফুটবলের শতবর্ষের ঐতিহ্য, গৌরব ও অনন্য উত্তরাধিকারের বহিঃপ্রকাশ।

কত সোনা রয়েছে ট্রফিতে বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ৩৬ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ দশমিক ১৭৫ কেজি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত