একশো বছর পর কেমন হবে আমাজন রেইনফরেস্টের ভবিষ্যৎ?

আমাজন বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট, যা ২০ লাখ বর্গমাইলেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বড়। পৃথিবীর পানিচক্র ঠিক রাখা এবং বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে এই বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এই বনের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ, পশুপাখি ও অদ্ভুত সব কীটপতঙ্গের আবাসস্থল।

দুঃখজনক হলো, এই সবুজ ফুসফুস দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের অবহেলার কারণে আমাজনের প্রায় ১৭ শতাংশ বন ইতিমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে বা পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। সেই জায়গাগুলো মূলত চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি বনের ভেতর থেকে তেল উত্তোলন এবং অবৈধভাবে খনিজ সম্পদ খোঁজার মতো কর্মকাণ্ড আমাজনের বুক ক্ষতবিক্ষত করছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী ১০০ বছর এই বনের টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাজন এখন এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে যেখান থেকে এটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, ১০০ বছর পর এই বন দেখতে কেমন হবে?

স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বের্নার্দো ফ্লোরেস এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, আমাজনে প্রতিনিয়ত চাষের জমি বাড়ানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন অপরাধ চক্র গাছপালা উজাড় করে বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, অবাধে বন উজাড় এবং ভয়াবহ দাবানল—এই তিনটি প্রধান বিপদ একসঙ্গে আমাজনের ওপর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করেছে; বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি আর শুষ্ক মৌসুমে বন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।

গবেষক ফ্লোরেস ব্যাখ্যা করেন, গাছপালা কমলে বৃষ্টিপাত কমে যায়, যা বনকে আরও শুষ্ক করে তোলে এবং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এই চক্রটি পুরো পৃথিবীর ওপর প্রভাব ফেলে। বন যত কমে, তাপমাত্রা তত বাড়ে, আর তাপমাত্রা বাড়লে আমাজন তত দ্রুত ধ্বংস হয়। শুকনো বন সামান্য আগুনেই দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। এছাড়া বনের ভেতর তৈরি করা রাস্তাঘাটও ব্যাপক ক্ষতি করছে। বিজ্ঞানীদের বড় চিন্তার কারণ সীমান্ত এলাকা বা বন উজাড়ের বৃত্তচাপ, যা প্রায় পাঁচ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে।

এই সীমান্ত অঞ্চলের বনগুলোতে গাছপালা দ্রুত মারা যাচ্ছে। বড় গাছের ফাঁকা জায়গাগুলোতে শক্ত ও মোটা পরজীবী লতা জন্মে মাটির পুষ্টি ও সূর্যের আলোর জন্য প্রতিযোগিতা করে, যার ফলে বড় গাছগুলো আলো-বাতাস না পেয়ে মারা যাচ্ছে। এছাড়া মানুষের আনা ক্ষতিকর বিদেশি ঘাস আগামী কয়েক দশকে ছড়িয়ে পড়বে। তবে এগুলো আফ্রিকার মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ তৃণভূমি তৈরি করবে না, বরং স্থানীয় উদ্ভিদকে ধ্বংস করবে।

আমাজন ধ্বংসের কারণে বন্য প্রাণী, বিশেষ করে জলজ প্রাণীরা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। খরায় জলাভূমি শুকিয়ে আগুন লাগার ফলে অনেক প্রজাতি হুমকির মুখে। আমাজন ওয়াচের মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান পোয়েরিয়ার জানান, বন ধ্বংস ও পানির উৎস বিষাক্ত হওয়ায় দীর্ঘদিনের আদিবাসীরাও ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

গবেষক ফ্লোরেস সতর্ক করেছেন যে আমাজন শেষ হলে বৈশ্বিক জলবায়ু ও আবহাওয়া এলোমেলো হয়ে যাবে। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকায় বৃষ্টি কমবে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়বে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলবে এবং সমুদ্রের পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। পৃথিবী একসময় অতি উষ্ণ ও বসবাসের অযোগ্য গ্রহে পরিণত হতে পারে। তবে অধ্যাপক আরি স্টাল একটি আশার কথা শুনিয়েছেন। তাঁর মতে, গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার মতো সংকটের চেয়ে আমাজনের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ। নতুন করে গাছ লাগিয়ে বন উজাড়ের ক্ষতিকর প্রভাব বন্ধ করা এখনো সম্ভব, তাই আমাজন বাঁচানোর আশা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি।