সংস্কারের জটিলতা ও প্রবাসে আলী রীয়াজ: জুলাই সনদ ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন

জুলাই সনদ ঘিরে রাজনৈতিক জটিলতা

দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত ‘জুলাই সনদ’ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই সনদকে কেন্দ্র করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।

বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’কে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাদের মতে, এটি কোনো অধ্যাদেশ বা আইন নয়, বরং সার্বভৌম পার্লামেন্টের অধিকার ক্ষুণ্ন করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা। বিএনপি ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর ও বাক্য ধারণ করলেও, তারা এমন সংস্কার চায় যা সংবিধানসম্মত এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট ঘোষণা করেছে যে, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থাকবে। তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে, সংস্কার এড়িয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইলে তার পরিণতি বিএনপি সরকারকে ভোগ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সতর্কতা ও আলী রীয়াজের ভূমিকা

বিশ্বের সংঘাত প্রতিরোধ ও প্রশমনে কাজ করা স্বাধীন থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) গত ২৩ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। আইসিজি জানায়, যদি বিএনপি অর্থবহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তাহলে জুলাই সনদের কট্টর সমর্থক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতে পারে এবং তাদের সমর্থকদের রাজপথে নামাতে পারে।

সংস্কার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ বিএনপির রাজনৈতিক পুঁজি ক্ষয় করতে পারে, যা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডার অন্যান্য দিক বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের মূল কারিগর হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক আলী রীয়াজ বর্তমানে দৃশ্যপটের বাইরে এবং তিনি প্রবাসে ফিরে গেছেন। অনেকে মনে করেন, জুলাই সনদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দায়ী। তাদের মতে, জুলাই সনদ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ড. ইউনূসকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকে দীর্ঘায়িত করা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংস্কার নিয়ে ঐকমত্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করেছে এবং ওই কমিশনের প্রভাবশালী সদস্যরা এখনো তা করে যাচ্ছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আলী রীয়াজের সহযোগীরাও অনেকটা লাপাত্তা। তবে সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে সরকারের পদক্ষেপের সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে অবস্থা সংকটে রূপ নেবে। ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া।’ তিনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আশঙ্কার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

জনগণের অংশগ্রহণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ইস্যুতে জনগণকে সেভাবে মাঠে নামানো সম্ভব হবে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক গত শনিবার বলেন, ‘২০২৪ সালে জনগণ শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য যেভাবে রাস্তায় নেমেছিল, সেভাবে এখন সংবিধান সংস্কারের জন্য তারা নামবে বলে আমার মোটেও মনে হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার ছিল অনির্বাচিত। ওই সরকার গঠিত ঐকমত্য কমিশন যে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করে দিয়েছে তার আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনা হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। ওই সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই আয়োজন করেছিলেন তাঁরা তো কেউ নির্বাচিত ছিলেন না। এখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ রয়েছে। এই সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানসম্মতভাবে সংস্কারের পথে যেতে হবে।’

ড. শাহদীন মালিকের মতে, জনগণের প্রধান চাহিদা ও প্রত্যাশা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান। অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোই এখন প্রধান। সংবিধানে কোথায় দাঁড়ি আছে, কোথায় কমা আছে, কোন লাইনে কী বলা আছে—এসব নিয়ে সাধারণ মানুষ ভাবছে বলে মনে হয় না। আর জুলাই সনদ অনুসারে যেভাবে সংবিধান সংস্কার চাওয়া হচ্ছে, তাতে সংবিধান বাতিল করতে হবে। কিন্তু তা বাতিল করার ক্ষমতা কারো নেই। এগুলো করেও সুফল পাওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। ভেনেজুয়েলায় ২৭ বার নতুন সংবিধান হয়েছে। এ রকম অনেক দেশ আছে, যেসব দেশে বারবার সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান করা হয়েছে। সেসব দেশের গণতন্ত্র সবচেয়ে ভঙ্গুর।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াত-এনসিপির আন্দোলনের ঘোষণা স্থিতিশীল রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে কি না, জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘প্রথমত জুলাই সনদ মহাবিতর্কিত একটি বিষয়। অংশগ্রহণকারী নানা রাজনৈতিক দলের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জামায়াত-এনসিপি চেষ্টা করছে এই মহাবিতর্কিত বিষয়টিকে পুঁজি করে রাজনীতির মাঠ গরম করতে। আমি মনে করি, জুলাই সনদ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ড. ইউনূসকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকে দীর্ঘায়িত করা।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে যারা পরাজয়ের দলিল মনে করে, তারাই আসলে এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। তবে জামায়াত-এনসিপি জুলাই সনদের আন্দোলন নিয়ে খুব বেশি সফল হবে বলে আমি মনে করি না। জনগণ এই আন্দোলনে সাড়া দেবে বলেও মনে হয় না। এ নিয়ে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই।’

জুলাই সনদ ও গণভোট চ্যালেঞ্জ করা বিচারাধীন রিট নিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘আমি এই রিটের অন্যতম একজন আইনজীবী। আমরা চেষ্টা করব আইনিভাবে এটার ফয়সালা করার।’

আইনি প্রক্রিয়া ও হাইকোর্টের রুল

উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল প্রশ্নে রুল শুনানির জন্য আগামী ১৭ জুন দিন নির্ধারণ করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৮ মে রুল শুনানির জন্য এ দিন নির্ধারণ করেন। এর আগে এর বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা ও আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলমের পৃথক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৩ মার্চ হাইকোর্ট রুল দেন। এতে ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদসচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিবকে চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এর পর জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ৬৬ জন সংসদ সদস্য ও এনসিপি এই মামলায় পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করলে আগামী ১৭ জুন রুল শুনানির দিন ধার্য করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো প্রশ্নের মুখে

জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত অনেক সংস্কার প্রস্তাব আসলেই দেশের জন্য কল্যাণকর কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন। সংবিধান সংস্কার কমিশনের দুজন সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া ও ফিরোজ আহমেদ রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কে লিখিত মতামতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় এটি প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরাল একটি ক্ষমতাবলয় তৈরি করতে পারে। এমনকি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত না হয়ে সংসদের বাইরে অন্য যেকোনো পর্যায়ে নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচিত হলেও রাষ্ট্রপতির পদটির নতুন একটি ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না। রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপের কারণে সংসদের দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত, বিঘ্নিত ও বিলম্বিত হতে পারে।’

তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, ‘রাজনৈতিক দলে ভাঙনের প্রবণতা এবং জন-অনাস্থা, উভয়টিই বৃদ্ধি পেতে পারে রাষ্ট্রপতির অসহযোগিতা ও বিরূপ ভূমিকার কারণে। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়াকে রাষ্ট্রপতির বাড়তি এখতিয়ারের বৈধতা হিসেবে গণ্য করতে পারে নানা রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং জনগণের একটি অংশ। এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে প্রধানমন্ত্রীকে কেবল সংসদের বিরোধিতারই মোকাবেলা করতে হবে না, তাঁকে রাষ্ট্রপতিকেও এবং তাঁর পেছনে জড়ো হওয়া শক্তিগুলোকেও মোকাবেলা করতে হতে পারে। এটা এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

এদিকে উচ্চকক্ষ গঠন সম্পর্কে অনেকেরই পর্যবেক্ষণ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, মালয়েশিয়ায় উচ্চকক্ষ গঠিত হয় রাজ্য বা প্রদেশ ভিত্তিতে। ওই সব দেশে নিম্নকক্ষ জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে, আর উচ্চকক্ষ প্রতিনিধিত্ব করে রাজ্য বা প্রদেশগুলোকে। তাঁরা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো প্রদেশ বা রাজ্য নেই। জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে আমাদের দেশে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকে লালন করার জন্য। তাদের অক্সিজেন সরবরাহের জন্য। উচ্চকক্ষ আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চায় সম্ভবত আরও ২০টা সমস্যা যোগ করবে। আমাদের ছোট্ট দেশ। সংসদে যত বেশি জনপ্রতিনিধি থাকবেন, রাজনীতি তত বেশি মাথাভারী হবে। সিঙ্গাপুর ছোট্ট দেশ, তাদের একটা কক্ষ। শ্রীলঙ্কার ৯টা প্রদেশ, তবু তারা এক কক্ষেই সন্তুষ্ট।’

বিশেষ কমিটি গঠন প্রস্তাবে বিরোধী দলের সাড়া নেই

‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর আলোকে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হলেও সেই প্রস্তাবে এখনো সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। দ্রুতই সাড়া মিলবে এমন কোনো আভাস মেলেনি। বরং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে টানাপোড়েন চলছে। এই উত্তাপ চলতি বাজেট অধিবেশনেও ছড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। আজ রবিবার বিকেলে এ অধিবেশন শুরু হবে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অধীনে দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে মতবিরোধ ছিল। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে সংসদের ভূমিকাকে অগ্রাধিকার দেয় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলটির মতে, গণভোট একটি রাজনৈতিক নির্দেশনা হতে পারে, কিন্তু সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কেবল সংসদের হাতেই রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনে করে, গণভোটই হচ্ছে জনগণের সরাসরি রায়, সেই অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ বৈধ কাঠামো। যে কারণে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পর পর দুটি শপথ নেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয়ী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী অন্যান্য দলের নির্বাচিত সদস্যরা। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ অনুষ্ঠানে সাফ জানিয়ে দেন, দ্বিতীয় শপথটি সংবিধানসম্মত নয়, সে কারণে তাঁরা সেই শপথ নেবেন না। এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। বিষয়টি নিয়ে চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। দুই দফা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ছাড়াও রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনাসহ অন্যান্য বিধিতে আলোচনা করেছেন সরকার ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। বিরোধী দল গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে সংসদের বাইরে আন্দোলন কর্মসূচিও পালন করছে। গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ কমিটিতে মোট সদস্য ধরা হয়েছে ১৭ জন। এর মধ্যে সরকারি দলের জন্য ১২ জন এবং বিরোধী দলের জন্য পাঁচজন রাখা হয়েছে। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো নাম দেয়নি। জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। দলটির নেতারা বলছেন, এটি গণভোটের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটানোর চেষ্টা।

তবে সরকারি দল বিএনপি এখনো আশাবাদী, বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত বিশেষ কমিটিতে তাদের প্রতিনিধিদের নাম যুক্ত করবে। বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের আগেই সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে চায় সরকারি দল। এ বিষয়ে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জুলাই সনদের প্রতিটি পর্ব অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবেন। সেই আলোকে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল পাঁচজনের নাম জমা দিলে বিশেষ কমিটির কার্যক্রম শুরু হবে।’ সংসদ অধিবেশনের শুরুতে সেটা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সংবিধান সংস্কারে প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল নাম না দিলে একতরফাভাবে বিশেষ কমিটি হতে পারে। একতরফাভাবে এ কমিটি গঠনের নজির অতীতে রয়েছে। জামায়াতের ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন বিষয়ে আমাদের কোনো মত ছিল না। আমরা চেয়েছি সংবিধান সংস্কার। যেহেতু এ বিষয়টি বিএনপি আমলে নেয়নি, আমরা তাদের সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটিতে যাব না। গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার বিষয়ে আমাদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। এটি চলমান থাকবে।’

বামপন্থীদের অবস্থান

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংস্কার নিয়ে ঐকমত্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের গঠিত ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ মুখে সংস্কারের কথা বললেও তাদের অন্য উদ্দেশ্য ছিল। তারা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করে বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে ১০ থেকে ২০ বছর দেশ পরিচালনা করতে চেয়েছিল। চব্বিশ ও একাত্তরকে তারা মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা (বামপন্থী দলগুলো) জুলাই সনদে স্বাক্ষর করিনি। কারণ, সেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের চার মূলনীতি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া জনস্বার্থবিরোধী বেশ কিছু প্রস্তাব রাখা হয়েছে।’

কন্টেন্ট: সংগৃহীত