মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন জটিলতা নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস: জুলাইয়ে দুই মাসের বকেয়া

দেশের বেসরকারি মাদরাসায় কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন এখনও পরিশোধ করা হয়নি। একই সঙ্গে জুন মাসের বেতন যথাসময়ে পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেতন সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন।

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা

মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন জটিলতা নিয়ে বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি এবং দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক আলহাজ্ব এ এম এম বাহাউদ্দীন গত ২১ জুন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এই বৈঠকে বেতন প্রদানে বিলম্বের কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বেতন বিলম্বের কারণ

আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসি)-এর মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার নতুন শিক্ষক-কর্মচারী বেসরকারি মাদরাসায় এমপিওভুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাদরাসায় মোট ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থের সংস্থান না করেই নতুনভাবে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এই বর্ধিত ভাতা প্রদান করতে গিয়ে পূর্বনির্ধারিত চলমান বাজেটে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে বেতন-ভাতা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।

সমাধানের আশ্বাস ও পদক্ষেপ

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে তিনি এবং তার মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে এবং বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, চলমান বাজেট থেকে শিক্ষকদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বেশি এই বড় অঙ্কের অর্থ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব নয়। তাই অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে মে এবং জুন মাসের বাড়িভাড়া সুবিধা প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে জুলাই মাসের শুরুতে একসঙ্গে দুই মাসের বেতন-ভাতা পাবেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। একই সঙ্গে, বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব থেকে মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় জনতা ব্যাংকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা থাকায়, যেসব শিক্ষকের হিসাব ওই ব্যাংকে আছে, তাদের বেতন এই সপ্তাহেই চলে যাবে।

ধন্যবাদ ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের আহ্বান

বৈঠকে বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি আলহাজ্ব এ এম এম বাহাউদ্দীন বেতন ছাড়ের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর আন্তরিক উদ্যোগ ও জোরালো পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সৃষ্ট উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা দ্রুত নিরসন হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করেছে।

শিক্ষকদের চরম সংকট

গত মে মাসের বেতন এখনও ছাড় না হওয়ায় দেশের এমপিওভুক্ত মাদরাসার ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী চরম সংকটে পড়েছেন। একই সঙ্গে জুন মাসের বেতন নিয়েও শঙ্কায় আছেন শিক্ষকরা। বেতন না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বকেয়া বেতন আদায়ের দাবিতে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট দফতরে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাচ্ছিল না।

অভিযোগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত

অভিযোগ উঠেছে যে, মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা ভারতে পলায়নের পর জামায়াতের কব্জায় চলে যায়। ওইসব কর্মকর্তারাই এখন সরকারকে বিপাকে ফেলতে নানা গাফিলতি এবং জটিলতার সৃষ্টি করছেন।

উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপদেষ্টা সি আর আবরার বাহবা নিতে বাজেট সংস্থান না করেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া বাড়ানো হয়। এই সুবিধার অঙ্ক ৫০০ কোটি টাকার বেশি, যা অর্থ সংকট থাকায় চলমান অর্থ বছরের শিক্ষা বাজেট থেকে প্রদান করা সম্ভব হয়নি। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও শিক্ষা উপদেষ্টা জামায়াত নিয়ন্ত্রিত থাকায় শুধুমাত্র বাহবা নিতে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে বিপাকে ফেলতেই ওই সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে, বাড়িভাড়ার এই বাড়তি সুবিধা দিতে না পারলে মাদরাসা শিক্ষকদের মধ্যে সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা অস্থিরতা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য ছিল।

বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিস্তারিত

  • প্রথম ধাপ: সরকারের সীমিত বাজেটের কথা বিবেচনা করে ১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ (সর্বনিম্ন ২০০০ টাকা) হারে নির্ধারণ করা হয়।
  • দ্বিতীয় ধাপ: পরবর্তীতে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে এই ৭ দশমিক ৫ শতাংশের অতিরিক্ত আরও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে সর্বমোট ১৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।