ভুয়া কাগজ দেখিয়ে কৃষকদের শত বিঘা জমি দখলের অভিযোগ প্রবাসী পল্লী হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে
নরসিংদীর মাধবদীর কান্দাইল মৌজায় “প্রবাসী পল্লী হাউজিং প্রকল্প”-এর বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজ দেখিয়ে কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল এবং সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী কৃষক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে প্রবাসী পল্লী গ্রুপ তাদের প্রভাব খাটিয়ে এলাকার খাল, বিল, নিচু জমি ও ফসলি জমি দখল করে আসছে।
উচ্চ আদালতের রিট পিটিশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতের একটি রিট পিটিশন (নং ৬১২৯/২০১)-এর কাগজ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে জমি বিক্রিতে চাপ সৃষ্টি করছে। প্রকৃতপক্ষে, ওই রিটে কেবল এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রশাসনকে মাত্র ৪ সপ্তাহের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই কাগজটিকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোম্পানিটি দাবি করছে যে, কান্দাইল মৌজায় প্রকল্প বাস্তবায়নের একক অনুমতি কেবল তাদেরই রয়েছে এবং সেখানে অন্য কেউ জমি কিনতে পারবে না। এমনকি এই অজুহাতে স্থানীয়দের উকিল নোটিশ পাঠিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নামমাত্র মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি ও ভরাট করার অভিযোগ
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের প্রকৃত কেনা জমির পরিমাণ খুবই সামান্য। মৌজার বাকি জমি কথিত বায়না ও জোরপূর্বক দখলে নিয়ে কেনাবেচা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৩৫৪, ১৩৬১, ১৩৬২, ১৩৭০, ১৩৭২, ১৩৯৩ ও ১৩৯৫ দাগের জমি বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। নামমাত্র মূল্যে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে কোম্পানির বিরুদ্ধে।
গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ
“প্রবাসী পল্লী হাউজিং প্রকল্প”-এর নামে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্লট দেওয়ার নামে সংগৃহীত এই বিপুল অঙ্কের অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, বিগত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের জেরে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রতিষ্ঠানটি এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। প্রবাসী পল্লী গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহিদুর রহমান মুহিদ ২০২১ সালে তাঁতী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর ভাই হাবিবুর রহমান হাবিব সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। বর্তমানে হাবিবুর রহমান এই কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং মুহিদুর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আদালতের রায় উপেক্ষা করে কার্যক্রম
ভুক্তভোগীরা জানান, গত ০২/১০/২০২৪ তারিখে এক দেওয়ানি মামলার (নং ১২১/২০২৪) রায়ে নরসিংদী সদর সহকারী জজ আদালত কান্দাইল মৌজার উল্লেখিত জমিতে কোনো প্রকার কাজ না করার জন্য নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসী পল্লী গ্রুপ আদালতের ওই রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জমিতে ভরাট ও অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুনরায় সক্রিয়
৫ আগস্ট ২০২৪-এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছুদিন পলাতক ছিলেন। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তারা পুনরায় প্রকল্প এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং নতুন করে জমি দখলের কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাধবদী থানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় তারা পুনরায় সেই পুরোনো রিট পিটিশনের (৬১২৯/২০১) অবতারণা করে প্রশাসনের সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলেও ভুক্তভোগীরা জানান।
ভুক্তভোগীদের হস্তক্ষেপ কামনা
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির মালিকরা এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, আদালতের রায় অবিলম্বে কার্যকর করে অবৈধ জমি দখল বন্ধ করা হোক এবং প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রবাসী পল্লী গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে অফিসের টিঅ্যান্ডটি ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে প্রবাসী পল্লী গ্রুপের ম্যানেজার আক্তারের মুঠোফোনে একাধিক বার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি ম্যানেজারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি যোগাযোগ করেননি। অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তীতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

