সাহিত্যিকদের নামে প্রাণীদের নামকরণ ও বিজ্ঞানীদের অদ্ভুত প্রবণতা

সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন

মার্কিন কবি মুরিয়েন রুকেসার বলেছিলেন, মহাবিশ্ব পরমাণু দিয়ে নয়, বরং গল্প দিয়ে তৈরি। মানুষ গল্প শুনতে ও পড়তে ভালোবাসে, আর তাই যুগে যুগে কবি ও সাহিত্যিকরা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে অমর হয়ে থাকেন। মজার বিষয় হলো, কেবল পাঠকরাই নয়, বিজ্ঞানীরাও এই লেখকদের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করেন। নতুন কোনো জীবজন্তু আবিষ্কারের পর তার বৈজ্ঞানিক নামকরণের সময় বিজ্ঞানীরা প্রায়ই তাদের প্রিয় লেখক বা চরিত্রের নাম বেছে নেন। এই প্রবণতাকে বলা হয় এপোনিমি (Eponymy)। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রিয় লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি জটিল বৈজ্ঞানিক নামগুলোকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় করে তোলেন।

ঈশপ থেকে হোমার: কিংবদন্তিদের উত্তরাধিকার

খ্রিষ্টপূর্ব ৬২০ সালের দিকে গ্রিসে জন্মগ্রহণ করা ঈশপের নীতিগল্প বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কথিত আছে, ঈশপ দাস ছিলেন এবং তার পিঠে একটি কুঁজ ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানীরা তাকে স্মরণ রাখতে বিলুপ্ত একটি পাখনাওয়ালা মাছের বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন Aesopichthys erinaceus। মাছটির শারীরিক গড়নের সাথে ঈশপের কুঁজের মিল থাকায় এমন নামকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মহাকবি হোমারকেও সম্মান জানানো হয়েছে কাঁকড়াজাতীয় একদল প্রাণীর গণের নাম Homeryon রাখার মাধ্যমে। হোমার অন্ধ ছিলেন বলে এই অন্ধ প্রজাতির প্রাণীদের এমন নাম দেওয়া হয়েছে। এই গণে Homeryon armariumHomeryon asper নামের দুটি প্রাণী রয়েছে।

দ্বিপদী নামকরণের ইতিহাস

সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস জীবের বৈজ্ঞানিক নামকরণের যে পদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন, তাকে দ্বিপদী নামকরণ বলা হয়। লিনিয়াসের পদ্ধতি অনুযায়ী, নামের প্রথম অংশটি গণ এবং দ্বিতীয় অংশটি প্রজাতি। যেমন মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম Homo sapiens, যেখানে হোমো গণ এবং স্যাপিয়েন্স প্রজাতিকে নির্দেশ করে।

শেক্সপিয়ার, কোনান ডয়েল ও অন্যান্য

ব্রিটিশ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের জন্মস্থান স্ট্রাটফোর্ড-আপওন-অ্যাভনে আবিষ্কৃত একটি ব্যাকটেরিয়ার নাম রাখা হয়েছে Legionella shakespearei। এছাড়া জার্মান লেখক জোনান উলফগ্যাং ভন গ্যাটের নামে বোলতার নাম Goetheana shakespearei এবং অণুজীবের নাম Cycladophora goetheana রাখা হয়েছে।

ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের সৃষ্ট শার্লক হোমসের গোয়েন্দা গল্পগুলো কালজয়ী। ব্রাজিলে আবিষ্কৃত প্রাগৈতিহাসিক উড়ন্ত সরীসৃপের ফসিলের নামকরণ করা হয়েছে Arthurdactylus conandoylei। এছাড়া মার্ক টোয়েনের নামে উত্তর আমেরিকার একটি বিটলের নাম রাখা হয়েছে Sonoma twaini। আবার রুডইয়াড কিপলিংয়ের ‘দ্য জাংগল বুক’-এর বাঘিরা চরিত্রের সাথে মিল রেখে একটি মাকড়শার নাম রাখা হয়েছে Bagheera kiplingi

লেখকদের নামে প্রাণীদের নামকরণের এই দীর্ঘ তালিকায় আরও রয়েছেন জোনাথান সুইফট, টেরি প্যাচেট, হারমান মেলভিল, আর্থার সি ক্লার্ক, ব্রাম স্টোকার এবং জে আর আর টোলকেইনের মতো অসংখ্য সাহিত্যিক।