ওষুধ গবেষণার জগতে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে এবার সরাসরি মাঠে নেমেছে মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটি চুপিসারে একটি নিজস্ব জীববিদ্যা গবেষণাগার বা ‘ওয়েট ল্যাব’ গড়ে তুলেছে, যেখানে তারা আধুনিক এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে। সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়াতে অবস্থিত এই গবেষণাগারের তথ্যটি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের লাইফ সায়েন্সেস বিভাগের প্রধান এরিক কাউডেরার-আব্রামস গত মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই নতুন উদ্যোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তাদের লক্ষ্য হলো প্রচলিত ওষুধশিল্পের নজর এড়িয়ে যাওয়া বিরল রোগগুলোর চিকিৎসাপদ্ধতি খুঁজে বের করা। এরিক বলেন, জীববিজ্ঞানের গবেষণায় কোনো কিছুর চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিত করতে এখনো বাস্তব ল্যাবের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আগামী আরও কিছুদিন এই বাস্তবতা বজায় থাকবে। তাই আমরা আমাদের কাজের একটি অংশ নিজস্ব ল্যাবে এবং বাকিটা বাইরের অংশীদারদের সাথে যৌথভাবে সম্পন্ন করছি।’
প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র পরবর্তীতে জানান, এই গবেষণাগারটি শুধুমাত্র ওষুধ আবিষ্কারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অ্যানথ্রপিকের সিইও ডারিও আমোডেইয়ের জন্য এই উদ্যোগটি ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমোডেইয়ের বাবা যে রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন, তার কয়েক বছর পরেই সেই রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। মূলত মানব কল্যাণে এআইকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য থেকেই এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এআই গবেষণার মাধ্যমে ওষুধ তৈরির পথটি সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ‘বাইস্পেসিফিক’ ও ‘ট্রাইস্পেসিফিক’ অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া এআইয়ের মাধ্যমে অনেক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। এগুলো মূলত জটিল অণু, যা একই সাথে শরীরের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম। তবে এই গবেষণায় অ্যানথ্রপিক ঠিক কোন কোন রোগ নিয়ে কাজ করছে বা তাদের অগ্রগতির হার কতটুকু, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।
ওষুধ শিল্পের বাস্তবতা হলো, ল্যাবে কার্যকর কোনো যৌগ শনাক্ত হওয়ার পরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হয়। অ্যানথ্রপিক এখনো সেই প্রাথমিক পর্যায়েই কাজ করছে। তাদের প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান গুগলের মালিকানাধীন ‘আইসোমরফিক ল্যাবস’ কয়েক বছর ধরে কাজ করলেও এখনো মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তারা তাদের এই লক্ষ্যমাত্রা পিছিয়ে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নির্ধারণ করেছে।
এর আগে, গত আগস্ট মাসে অ্যানথ্রপিক ‘মডেল হার্ডওয়্যার স্ট্যান্ডার্ড’ চালু করেছে, যা এআই প্রযুক্তিকে সরাসরি বিভিন্ন ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি পরিচালনার সক্ষমতা দেয়। যদিও এটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষকদের তৈরি ‘পাই-ল্যাব-রোবট’ প্রোগ্রাম থেকে ভিন্ন এবং এর সাথে পূর্বের কোনো কার্যক্রমের সরাসরি সংযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে এই ল্যাবটি কেবল একটি ছোট পদক্ষেপ। এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা বা মানুষের চাকরি হারানোর ভয়ের প্রেক্ষিতে, এআই যে মানুষের জীবনের জন্য ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয়, সেটি প্রমাণ করতেই অ্যানথ্রপিক এমন সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের জীববিদ্যাবিষয়ক গবেষণা এখন আর কেবল ‘ইন সিলিকো’ বা কম্পিউটারে মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চাকরির আরও তথ্য: একই সঙ্গে মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়া কিংবা মানুষের অস্তিত্বের ওপর হুমকি তৈরি করার কারণে কর্মীরা ও সাধারণ মানুষ যাতে এআইয়ের প্রয়োজনীয়তা বা উপকারের ওপর থেকে আস্থা না হারিয়ে ফেলে, তার আগেই কাজটি করে দেখাতে চায় অ্যানথ্রপিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই ওষুধ গবেষণা কর্মসূচির সাফল্য যে নিশ্চিত, তা বলা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার প্রমাণ দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বেশির ভাগ ওষুধই ব্যর্থ হয়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা কাউডেরার-আব্রামসের বক্তব্যেও একই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিঃসন্দেহে এর সবচেয়ে বড় সুযোগ বা সম্ভাবনা রয়েছে জীবনবিজ্ঞানে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাউডেরার-আব্রামসের মতে, যেসব রোগকে আগে ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তোলা অসম্ভব বা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হতো, সেগুলোর চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনে বড় গতি এনে দিতে পারে এআই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষণাগারসহ বিভিন্ন শিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির (অটোমেশন) প্রসার ঘটাতে গত আগস্টেই ‘মডেল হার্ডওয়্যার স্ট্যান্ডার্ড’ চালু করেছে অ্যানথ্রপিক।

