কিম জং–উনের বিলাসী জীবন: ওয়ানসান উপকূলে বিশাল নৌযানের আনাগোনা

উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান উপকূলে চলতি বছরের জুলাই থেকে মাঝ আগস্ট পর্যন্ত কৃত্রিম উপগ্রহের তোলা একাধিক ছবিতে ৮০ মিটার বা ২৬৩ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি বিলাসবহুল নৌযানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এই প্রমোদতরিটির সবচেয়ে নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য হলো এর ডেকে থাকা ৫০ মিটারের একটি সুইমিংপুল, যার সাথে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ওয়াটার স্লাইড। দীর্ঘ সময় মেরামতকেন্দ্রে থাকার পর জুলাই মাসের শুরুর দিকে এটিকে কালমা উপদ্বীপের উপকূলীয় জলসীমায় আনা হয়, যা কিম পরিবারের অবকাশ যাপনের জন্য একটি পরিচিত স্থান। গ্রীষ্ম এলে সেখান থেকে বের করে কিম জং–উনের ভিলা বা কালমার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে শাসনব্যবস্থার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। কেবল নৌযানের অবস্থান দেখে কিম বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঠিক কখন কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

কিম জং–উনের বিলাসবহুল ভিলার আশপাশে শুধু এই একটিই নয়, বরং ৫০, ৫৫ ও ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের আরও তিনটি নৌযান বারবার দেখা গেছে। বিবিসি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নৌযানগুলো কিম ও তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্যই রাখা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির ‘৩৯ নম্বর দপ্তরে’ কাজ করা সাবেক কর্মকর্তা রি জং হো জানিয়েছেন, শীতকালে এসব নৌযান জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে রাখা হলেও গ্রীষ্মকালে সেগুলো কালমা উপকূলে নিয়ে আসা হয়। ৩৯ নম্বর দপ্তরটি মূলত উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজ তদারকি করে থাকে।

একনায়কতান্ত্রিক দেশটিতে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে শাসকের এই বিলাসিতার রয়েছে বিশাল পার্থক্য। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ, যার বাজেটের বড় অংশ সামরিক খাতে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়। ২০২৫ সালের জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটছে এবং জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার নজির রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য সংকটে দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার হলেও কিম পরিবারের এই বিলাসিতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। দেশটির অর্থনীতির প্রকৃত চিত্রও অস্পষ্ট। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সংস্থা অনুমানের ভিত্তিতে উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। নাগরিকদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকটের কারণে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই অপুষ্টিতে ভুগছেন। অথচ সাধারণ মানুষের এই অনাহার-অর্ধাহারের বিপরীতে উত্তর কোরিয়ার শাসকেরা দশকের পর দশক ধরে কাটিয়ে আসছেন বিলাসী জীবন। জীবনীকার ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ানসান শহরটির সঙ্গে কিম পরিবারের নাড়ির টান বহু পুরোনো। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া ওয়ানসান কালমা অবকাশকেন্দ্রে রুশ পর্যটকদের ভ্রমণের ছবি প্রকাশ করেছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রটি তৈরি করা হলেও স্থানীয় পর্যটকদের জন্যও এটি উন্মুক্ত। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি অবসর কাটানোর সময়ই পায় না।

নৌযানগুলোর দাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এগুলোর একেকটির মূল্য কয়েক কোটি থেকে ১০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর আগে কিমের ব্যবহৃত ২৯ মিটার দৈর্ঘ্যের ‘প্রিন্সেস’ প্রমোদতরিটির মূল্য প্রায় ৭০ লাখ ডলার বলে ধারণা করা হয়েছিল। যখনই কিম জং–উন দীর্ঘ সময়ের জন্য লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান, তখনই এই নৌযানগুলোর নড়াচড়া বৃদ্ধি পায়, যা রাষ্ট্র কর্তৃক গোপন রাখা কোনো কার্যক্রমের আভাস দেয়। ফলে এটি স্পষ্ট, সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে তাঁদের এমন কিছু কর্মকাণ্ড চলে, যা রাষ্ট্র কখনোই প্রকাশ করে না।

ওয়ানসানের সঙ্গে কিম পরিবারের শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

কিম জং–উন তাঁর মায়ের সঙ্গে এই শহরেই বড় হয়েছেন। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত কিম জং–ইলের ভিলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি জানান, ওয়ানসানের উপকূলে শুধু অভিজাত পরিবারের সদস্যদেরই যাতায়াত ছিল। এছাড়া ২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়া সফরে গিয়ে সাবেক বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান কিম জং–উনের সঙ্গে ওয়ানসানে সময় কাটানোর কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় তাঁরা ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযান ব্যবহার করেছিলেন, যা ফেরি ও ডিজনিল্যান্ডের ক্রুজের সংমিশ্রণ ছিল। সেখানে কিম ও তাঁর পরিবারের সাঁতার কাটা ও বিনোদনের কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত কিম জং–ইলের ভিলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক দেশত্যাগী ব্যক্তি বলেন, ওয়ানসানের আশপাশের ভিলাগুলোতে শুধু অভিজাতদেরই যাতায়াত ছিল এবং গ্রীষ্মের দিনে তিনি সেখানে অনেক শিশু-কিশোরকে পানিতে স্কি করতে দেখেছেন। দেশ ত্যাগ করেছেন, এমন কয়েকজন বিবিসিকে বলেছেন, কিমের পরিবার যে ওয়ানসানে অবকাশযাপন করে, তা তাঁরা জানতেন।

যদিও ওয়ানসান কালমা অবকাশকেন্দ্রটি পর্যটনের জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং সেখানে বহুতল হোটেলসহ ২০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও সাধারণ উত্তর কোরীয়দের কাছে অবকাশ যাপন এক বিলাসিতা। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওয়ানসানে রয়েছে বহুতল হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, ক্রীড়াসুবিধা ও জলবিনোদনকেন্দ্র।

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৬৬৭ ডলার। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৩৬ হাজার ২২৭ ডলার।

যেখানে ভ্রমণ প্যাকেজের দাম ১০০ ডলারের মতো, তা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় অংকের অর্থ।

তাছাড়া আইন অনুযায়ী ১৪ দিনের বার্ষিক ছুটি থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

নিজের শহর বা জেলার বাইরে ভ্রমণেও সরকারি অনুমতির কড়াকড়ি থাকায় অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা নেই বললেই চলে।

স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণকারী জং সঙ–হাকের মতে, ৫০ ও ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যের নৌযানগুলো তে ও সিন দ্বীপের আশপাশে দেখা গেছে, যেখানে ছোট নৌকা দিয়ে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ করা হয়। দ্বীপগুলোর নির্জনতা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সুবিধাজনক। রি জং হো আক্ষেপ করে বলেন, একদিকে যখন সাধারণ মানুষ দিনে এক বেলা আহার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র কিম জং–উনকে ‘জনগণের নেতা’ হিসেবে আত্মত্যাগী হিসেবে প্রচার করে, অথচ তাঁর বহরে রয়েছে চারটি বিশাল বিলাসবহুল নৌযান।