অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন তিনি। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দিলে সেখান থেকে তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এর আগে শনিবার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর সময় তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়, যা নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। রোববার বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। যদিও শুরুতে সেই নির্দেশের খবর অস্বীকার করেছিলেন ইশরাক, তবে পরবর্তীতে অডিওবার্তার মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। এই নিয়ে সরকারের আট মাসের মাথায় দু’জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা ঘটল। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে অভিযানটির মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো। ইশরাক বলেন, আমি মনে করছি যে আমার এই মাদকের বিরোধী অভিযান কেবলমাত্র শুরু হলো, এটি চলমান থাকবে। তার বক্তব্য, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এর বিস্তার কমানো সম্ভব।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন জানান, তার কারণে যাতে সরকার বা বিএনপি কোনো ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না পড়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সেই চিন্তা থেকেই তিনি এই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার পাশাপাশি মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন, যা তিনি পেয়েছেন বলেও দাবি করেন। ইশরাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী যুদ্ধে অটল থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছ, চালিয়ে যাও।’ ইশরাকের ভাষ্য, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।
অভিযানের সময়ের ব্যাখ্যায় ইশরাক জানান, ১৭ই অক্টোবর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে তিনি নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলটি হাতে নিয়েছিলেন। সেখানে একদল মানুষকে ছুটোছুটি করতে দেখে তিনি সতর্ক ছিলেন। তার দাবি, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে হেরোইন, মদ, দেশীয় অস্ত্র এবং ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। তিনি জানান, পুলিশের সামনেই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তার উদ্দেশ্য কাউকে নিজে শাস্তি দেওয়া ছিল না, বরং তাদের আইনের হাতে তুলে দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য। এছাড়া তার নামে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, যার মধ্যে রাইফেলটি অভিযানে অন্য এক লাইসেন্সধারী সহকর্মীর কাছে ছিল বলে তিনি জানান। তার দাবি, পরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখতে পান। কয়েকটি ভবনে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আগেভাগে জানালে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের খবর দেয়া হতো বলে তার ভাষ্য। এসব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে দাবি করেন ইশরাক। তিনি দাবি করেন, অস্ত্রটি তিনি কাউকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। তিনি বলেন, ঢাকা-৬ আসনসহ আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান।
নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যত ও মেয়র নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন জানান, এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কেবল দল ও দলের প্রধান তারেক রহমানের। ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরীর সমস্যা ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতা নিয়ে তিনি কাজ করছেন। দল যদি তাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়, তবে তিনি তা গ্রহণে প্রস্তুত আছেন। আবার অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে তার হয়েও কাজ করবেন বলে জানান তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকার বাসিন্দারা মাদক কেনাবেচা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন বলে দাবি করেন ইশরাক। তার ভাষ্যমতে, এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৮ই সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ১৭ই অক্টোবর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ইশরাক দৃঢ় কণ্ঠে জানান, প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়লেও তিনি মাদক নির্মূলে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। মাদক সরবরাহকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই তার লক্ষ্য বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে দলীয় নেতাকর্মীদের স্লোগানমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে তিনি প্রেস ক্লাব ত্যাগ করেন। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি পত্র পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

