কুমিল্লা নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদল কর্মী আবু কাউছার (৪৩) হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই কবির হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেছেন। গত শুক্রবার সকালে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির পূর্ব পাশে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে গুরুতর আহত কাউছারকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রোববার কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়। মামলা দায়ের নিয়ে থানায় হট্টগোল: ‘দরকার হইলে আমরা এমপি-মন্ত্রীরে আনামু’।
মামলার এজাহারে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন তৌহিদুল ইসলাম ওরফে তৌহিদ, তাঁর ভাই তানজির আলম, তাঁদের বাবা খোরশেদ আলম, সাইফুল ইসলাম (সুমন) এবং ফরহাদ হোসেন। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রধান আসামি তৌহিদ ও তাঁর ভাই তানজিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার তাঁদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন জানানো হলে বিচারক সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। শুনানি শেষে কুমিল্লার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহাদ রায়হান ভূঁইয়া সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বাদী কবির হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, কাউছার কাপ্তান বাজার এলাকায় ব্যবসায়িক সহযোগী শামীম হোসেন, হেলাল উদ্দিন ও গোলাম রসুলের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। ব্যবসায়িক অংশীদার শামীম গোমতী নদীর চরের ৮ থেকে ১০ কানি জমি ইজারা নিয়ে সেখানে নেপিয়ার ঘাস চাষ করছিলেন। এজাহারে দাবি করা হয়, আসামিরা ওই জমির সামনে জোরপূর্বক কফি হাউস নির্মাণ করতে চাইলে বিরোধ তৈরি হয়। পরে আসামিরাই আপস-মীমাংসার কথা বলে ১৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কাউছারকে ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির কাছে ডেকে নেন। তাঁরা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে অটোরিকশার গতি রোধ করেন আসামিরা। অন্য একটি অটোরিকশায় ছিলেন হেলাল উদ্দিন, আরমান, আবদুল বারেক ও ইসমাইল।
ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর কাউছার ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর আসামিরা অতর্কিত হামলা চালান। মামলার বিবরণে অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুল ইসলাম চাপাতি দিয়ে কাউছারের পিঠে আঘাত করেন এবং ফরহাদ হোসেন সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে বুকের ডান পাশে আঘাত করার চেষ্টা করলে কাউছার হাত দিয়ে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় কাউছারকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে অটোরিকশাচালক মাসুমকেও রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন তানজির। হামলার পর আসামিরা দুটি মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ সময় সাক্ষীরা চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসতে থাকেন।
পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বপরিকল্পনা ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। জনতার হাতে ধরা পড়লেন মূল অভিযুক্ত, জামায় ছিল রক্তের দাগ।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১১ এর অনুসন্ধানেও হামলার সত্যতা উঠে এসেছে। কাউছার হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে গত শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১১।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তৌহিদ ও তাঁর সঙ্গীরা আগে থেকেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় অবস্থান করছিলেন। ঘটনার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত তৌহিদের বিরুদ্ধে এর আগেও হত্যা মামলাসহ সাতটি মামলা রয়েছে, যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি জামিনে ছিলেন। অপর আসামি তানজিরের বিরুদ্ধেও একটি মামলার তথ্য মিলেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
জমির মালিকানা নিয়ে মামলার এজাহার ও পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। মামলার এজাহারে জমিটি আইনজীবী মিজানের কাছ থেকে ইজারা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জমিটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মালিকানাধীন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মামলার পরবর্তী তদন্তে পুরো বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার জানিয়েছেন।
এদিকে, এই মামলা দায়েরের সময় থানায় কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তদন্তের স্বার্থে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও অন্য সহযোগীদের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

