সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় ছিল প্রবল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ, তার ওপর প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হার এবং মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার দুঃস্মৃতি—সব মিলিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের ওপর বাজি ধরার মতো মানুষ ছিল খুবই কম। কিন্তু ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে প্রথম দিনেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সেই সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে এক দারুণ লড়াইয়ের বার্তা দিল।
টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। উইকেটে আর্দ্রতা থাকলেও বাংলাদেশের পেসাররা সেই সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগান। হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন চৌধুরির তোপে মাত্র ১৯৮ রানেই গুটিয়ে যায় স্বাগতিকদের ইনিংস। দিনশেষে বাংলাদেশ ১ উইকেটে ৯৬ রান তুলে বেশ স্বস্তিতেই মাঠ ছেড়েছে। এখনো ১০২ রানে পিছিয়ে থাকলেও মুমিনুল হক ও তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটে বাংলাদেশ বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখছে।
এদিন বল হাতে নায়ক ছিলেন হাসান মাহমুদ। ৫৫ রান খরচায় ৬ উইকেট শিকার করে তিনি নিজের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটিই কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা বোলিং পরিসংখ্যান। প্রথম ঘণ্টার শেষ দিকে হাসান শুরু করেন তার তোপ। উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর ট্রাভিস হেডকে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন তিনি। পরবর্তীতে প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে স্বাগতিকদের কোমর ভেঙে দেন এই পেসার।
হাসানের পাশাপাশি তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন চৌধুরিও ছিলেন দুর্দান্ত। ইবাদতের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন মার্নাস লাবুশেন, আর লাঞ্চের ঠিক আগে ক্যামেরন গ্রিনকে সাজঘরে ফেরান তিনি। দ্বিতীয় সেশনে অ্যালেক্স ক্যারিকে বোল্ড করেন এবাদত। তাসকিন আহমেদ অফ স্টাম্পের বাইরের এক চমৎকার ডেলিভারিতে বাউ ওয়েবস্টারকে বোল্ড করেন। অস্ট্রেলিয়ার ১০টি উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা, যা টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো এমন কীর্তি। এর আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে এমন সাফল্য পেয়েছিল বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছিলেন স্টিভেন স্মিথ। ব্যক্তিগত ২ রানে জীবন পাওয়ার পর তিনি ৭১ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেন। শেষ পর্যন্ত হাসানের শর্ট বলে ক্যাচ দিয়ে তিনি বিদায় নেন। এছাড়া নাথান লায়নকেও আউট করে হাসানের ৬ উইকেট পূর্ণ হয়। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে এটিই তাদের সর্বনিম্ন টেস্ট স্কোর। ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়া ২১৭ রানে অলআউট হয়েছিল, যা ছিল আগের সর্বনিম্ন।
ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই জীবন পান তানজিদ হাসান তামিম। মিচেল স্টার্কের বলে নাথান লায়ন সহজ ক্যাচ মিস করলে রানের খাতা খোলার আগেই বেঁচে যান তিনি। এরপর তানজিদ ও সাদমান ইসলাম আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করেন। নবম ওভারে স্টার্কের বলে সাদমান ২০ রান করে আউট হলেও তানজিদ ও মুমিনুল হক আর কোনো বিপদ হতে দেননি।
দিনশেষে মুমিনুল হক ৪৯ বলে ৩৫ এবং তানজিদ হাসান ৬৭ বলে ৩২ রানে অপরাজিত আছেন। তাদের অবিচ্ছিন্ন জুটি ইতোমধ্যে ৬০ রান যোগ করেছে। প্রথম দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি চিত্র।
টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি হাসানের তৃতীয় পাঁচ উইকেট শিকার। এর আগে পাকিস্তান ও ভারতের মাটিতেও তিনি পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। ডারউইনের এই পারফরম্যান্স বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের সামর্থ্যকে আবারও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
৪৫ রানের উদ্বোধনী জুটি ভেঙে জ্যাক ওয়েদারাল্ডকে ২৩ রানে ফেরান তিনি।
পরের ওভারেই ট্রাভিস হেডকে ২২ রানে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেন।
লাঞ্চে যাওয়ার সময় অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ৪ উইকেটে ৭৪।
তবে বাংলাদেশের পেসারদের দিনটা আরও উজ্জ্বল হতে পারত।
জীবন পেয়ে স্মিথ অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একাই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
দ্বিতীয় সেশনের পানি বিরতির পর প্রথম বলেই ক্যারিকে ১৯ রানে বোল্ড করে সেই জুটি ভেঙে দেন এবাদত।
এক প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়লেও অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন স্মিথ।
৮ উইকেটে ১৮২ রান নিয়ে চা বিরতিতে যায় অস্ট্রেলিয়া।
শেষ সেশনে পাঁচ ওভারও টিকতে পারেনি স্বাগতিকরা।
এর আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে একই ঘটনা ঘটেছিল।
এবার ডারউইনে মাত্র ৫৩ ওভারে তাদের ইনিংস শেষ হয়ে গেল ১৯৮ রানে।
অস্ট্রেলিয়াকে দ্রুত গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটাও ছিল আশাব্যঞ্জক।
বলের নিচে দীর্ঘক্ষণ থেকেও সেটি তালুবন্দী করতে পারেননি নাথান লায়ন।
লেগ স্টাম্পের বল আগেই খেলতে গিয়ে লিডিং এজ হয়ে কাভার-পয়েন্টে ক্যাচ দেন সাদমান।
অন্য প্রান্তে তানজিদও সুযোগ বুঝে রান সংগ্রহ করতে থাকেন।

