তাপঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন ও ভয়ংকর রূপ

বিশ্বজুড়ে এখন তাপপ্রবাহ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পস্থায়ী ঘটনা নয়, বরং তা বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং মাসের পর মাস স্থায়ী হচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ‘তাপঝড়’ বা হিট স্টোর্ম হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের সংজ্ঞায়, কোনো এলাকায় টানা পাঁচ দিন বা তার বেশি অস্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ ধরা হয়। যখন এই পরিস্থিতি পৃথিবীর অন্তত এক শতাংশ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকেই বলা হচ্ছে তাপঝড়।

রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গত ছয় দশকের তাপমাত্রার তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তাপঝড় সক্রিয় ছিল, যা বর্তমান দশকে বেড়ে প্রায় ১০২টিতে দাঁড়িয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি প্রায় ৪৬ দিন স্থায়ী ছিল এবং আটলান্টিক মহাসাগরসহ লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম আফ্রিকার প্রায় ছয় শতাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করেছিল। বিপরীতে, চলতি দশকের সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি রেকর্ড ৩৬৭ দিন স্থায়ী ছিল এবং পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রয়টার্সের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তাপঝড় সক্রিয় থাকত। রয়টার্স বিশ্বের ১০ লাখের বেশি ভৌগোলিক এলাকার ১৯৬০ সাল থেকে প্রতিদিনের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকের সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি প্রায় ৪৬ দিন ধরে আটলান্টিক মহাসাগর, লাতিন আমেরিকার কিছু অংশ ও পশ্চিম আফ্রিকার ওপর বিস্তৃত ছিল। তাপঝড়ের প্রভাব শুধু অসহনীয় গরমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকার এক সপ্তাহে স্বাভাবিকের অতিরিক্ত ১০ হাজারের বেশি মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে।

এই দীর্ঘস্থায়ী তাপঝড়ের পেছনে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্রমবর্ধমান মাত্রাকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে। গত ছয় দশকে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং একই সময়ে তাপঝড়ে আক্রান্ত পৃথিবীর গড় আয়তন ১২ গুণেরও বেশি বেড়েছে। এছাড়া এল নিনোও তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বেজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানির পর্যায়ক্রমিক ঘটনা এল নিনোও তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করছে। গ্রীষ্মকালে ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ এবং স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনার সঙ্গে এই তাপপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘রাইমুন্ডো’ নামের তাপপ্রবাহটি পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করেছে। ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে ইউরোপের বড় অংশে তীব্র গরমে রেললাইনের ইস্পাত বেঁকে যায়।

একই সময়ের মধ্যে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী আরেকটি রেকর্ড গড়া তাপঝড় বিশ্বের ৮৫ শতাংশ এলাকাকে কোনো না কোনো সময় আক্রান্ত করেছে।

এই তাপঝড়গুলোর ভয়াবহ প্রভাবের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের মক্কায় হজের সময় ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা, যেখানে ১৩০০-এর বেশি হজযাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় দীর্ঘস্থায়ী খরা, লিবিয়ার দেরনায় বন্যা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দাবদাহে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এতে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে লিবিয়ার দেরনা শহরে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যাও দেখা দেয়।

নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের অধ্যাপক জেমস রেনউইক সতর্ক করে বলেছেন, তাপঝড় বৈশ্বিক সভ্যতার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই তীব্র তাপ। এর ফলে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ এবং সম্পদের জন্য নতুন নতুন সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। এ কাজে দুই ডজন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকের মতামতও নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাপঝড় কেবল অসহনীয় গরমই বাড়াচ্ছে না, বরং তা খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রত্যক্ষ প্রভাবগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, রয়টার্সের এই প্রতিবেদনটি তারই একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে জলবায়ু ঝুঁকিগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে।