বর্ষার পানিতে প্রাণ ফিরেছে চলনবিলে, বেড়েছে ডিঙি নৌকার কদর

টানা বর্ষণের ফলে দেশের বৃহত্তম বিলাঞ্চল চলনবিল আবারও তার চিরচেনা রূপ ফিরে পেয়েছে। নদী, খাল ও বিলের পানি উপচে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সড়কপথের বদলে এখন গ্রামবাসীর যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ডিঙি নৌকা। বর্ষার নতুন পানিতে মাছ ধরার মৌসুম শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে ছোট কাঠের নৌকার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে নাটোরের গুরুদাসপুরসহ চলনবিল-ঘেঁষা বিভিন্ন উপজেলার নৌকা তৈরির কারখানাগুলোতে এখন কর্মচাঞ্চল্যের মৌসুম চলছে। একসময় দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং বিলের বুক চিরে সড়ক নির্মাণের কারণে চলনবিল অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। তবুও প্রতি বছর বর্ষা এলে বিলটি তার হারানো যৌবন ফিরে পায় এবং দ্বীপসদৃশ গ্রামগুলোর মানুষের জীবনযাত্রায় ডিঙি নৌকা হয়ে ওঠে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন।

বর্তমানে নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিভিন্ন কারখানায় পুরোদমে কাঠের ডিঙি নৌকা তৈরির কাজ চলছে। তবে চলনবিল অঞ্চলে ডিঙি নৌকার অন্যতম বৃহৎ মোকাম হিসেবে গুরুদাসপুর এলাকাটি বিশেষভাবে পরিচিত। ভৌগোলিক সুবিধা ও সহজলভ্য কাঠের কারণে এখানে অন্তত ১৫ থেকে ১৮টি কারখানায় সারা দিন হাতুড়ি, করাত ও প্লেন মেশিনের শব্দে কর্মমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কারিগররা অত্যন্ত নিপুণভাবে নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত। কেউ কাঠ কাটছেন, কেউ পেরেক বসাচ্ছেন, আবার কেউ নৌকার তলা মসৃণ করতে প্লেনসিট লাগাচ্ছেন। শিমুল, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, কাঁঠাল, আম, বট ও নিমগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি এসব নৌকা সড়কের ধারে সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো আকার ও মানের নৌকা যাচাই করে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

বাজারে সাধারণ ডিঙি নৌকা ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় এবং প্লেনসিটযুক্ত নৌকা ৮ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারখানার মালিক ইয়ারুল, শামীম, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, কাঠ, লোহা ও পেরেকসহ সব ধরনের কাঁচামালের দাম এবং শ্রমিকের মজুরি আগের চেয়ে বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমাণ কমে গেলেও বর্ষা মৌসুমের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তারা উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন।

কারিগর আফজল ও শরীফ জানান, গত বছর পানি কম থাকায় নৌকার বিক্রি ছিল খুবই হতাশাজনক। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় কাজের চাপ অনেক বেশি। তারা প্রতিদিন গড়ে দুটি করে নৌকা তৈরি করছেন এবং প্রতিটি নৌকা তৈরির জন্য এক হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছেন।

নাটোর সদর, সিংড়া, পাবনার চাটমোহর ও ছাইকোলা, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং মাগুরা গ্রামের আলতাফ মাঝি, রফিজ সরদার, বুলবুল ও মজিদ জানান, বর্ষা মৌসুমই তাদের জীবিকার প্রধান সময়। এ সময়ে কৃষিকাজ কম থাকায় মাছ ধরেই তাদের সংসার চলে। চলনবিলে যাতায়াতের অন্যতম ভরসা হওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই তারা নতুন ডিঙি নৌকা কিনতে গুরুদাসপুরে এসেছেন। তাদের মতে, বর্ষা এলেই চলনবিলজুড়ে নৌকার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

গুরুদাসপুর উপজেলা ফার্নিচার পট্টি মালিক সমিতির সভাপতি শামীম বলেন, দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি ডিঙি নৌকার সুনাম অনেক দিনের। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার চাঁচকৈড় হাটে নৌকার বাজারে চলনবিলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা আসেন। মানসম্মত নৌকা তুলনামূলক কম দামে পাওয়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এ বাজারে ব্যাপক বেচাকেনা হয় বলে তিনি জানান।