বাংলাদেশে স্যামসাং স্মার্টফোন উৎপাদন ও গবেষণার নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের বাজারে একসময় স্যামসাংয়ের মোবাইল ফোন, টেলিভিশন বা গৃহস্থালি সামগ্রী মানেই ছিল দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নির্ভরতা। সময়ের আবর্তনে সেই চিত্র বদলে গেছে। আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলাদেশে বৈশ্বিক এই ব্র্যান্ডটির স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রম এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

দেশে স্যামসাংয়ের স্থানীয় উৎপাদনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০১৭ সালে। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে নরসিংদীর শিবপুরে স্থানীয় অংশীদার ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের কারখানায় স্যামসাং স্মার্টফোনের স্থানীয় সংযোজন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রায় ৫৮ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই কারখানায় প্রাথমিকভাবে ৪জি স্মার্টফোন উৎপাদনের সাহসী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই কারখানায় বছরে ২৫ লাখ মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

মাঝখানে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে একটি সাময়িক বিরতি এসেছিল। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ১৮ মাস বাংলাদেশে স্যামসাং স্মার্টফোনের স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ব্যবসায়িক পরিবেশের আকস্মিক পরিবর্তন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ৪জি প্রযুক্তি থেকে ৫জি প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো স্থাপনের চাহিদাই ছিল এই উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ। তবে এই স্থবিরতা কাটিয়ে ২০২৬ সালে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্যামসাং স্মার্টফোন আবার বাজারে ফিরছে। উৎপাদন সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে নতুন করে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের উৎপাদন বাড়াচ্ছে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস।

মোবাইল ফোনের পাশাপাশি গৃহস্থালি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নরসিংদীর এই কারখানা বড় অবদান রাখছে। বর্তমানে এখানে স্যামসাংয়ের রেফ্রিজারেটর তৈরি হচ্ছে। এছাড়া ওয়াশিং মেশিন, টেলিভিশন এবং এয়ার কন্ডিশনারের মতো প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সরঞ্জামও এ কারখানায় সংযোজন ও তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয় এই শিল্প উদ্যোগ শুধু আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতাই কমায়নি, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি জ্ঞান স্থানান্তর এবং স্থানীয় সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।

উৎপাদনের পাশাপাশি বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের এই অগ্রযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D)। স্যামসাংয়ের বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে ‘স্যামসাং রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ’। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় দক্ষ প্রকৌশলীরা বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়নে কাজ করছেন, যা দেশের সামগ্রিক আইসিটি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।

এই দ্বিমুখী উন্নয়ন কার্যক্রম দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন নরসিংদীতে অবস্থিত ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের কারখানাটি পরিদর্শন করেন। এই পরিদর্শনের সময় তিনি ফেয়ার ইলেকট্রনিকসকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার দৃঢ় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের একটি অনন্য প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সাথে স্যামসাং বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুংমিন জুং এ দেশে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রতি তাদের শক্তিশালী অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

আমদানি করা তৈরি পণ্য বিক্রির সীমানা পেরিয়ে স্যামসাংয়ের এই যাত্রা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি মানচিত্রে একটি নতুন পরিচয়ে তুলে ধরছে। স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্রাংশ তৈরি এবং মূল সংযোজন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে এই শিল্পের বিকাশকে আরও টেকসই করা যায়, সেটিই এখন এই খাতের আগামী দিনের মূল লক্ষ্য ও বড় চ্যালেঞ্জ।