বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত দেশ: অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল ও অব্যবস্থাপনার দায়

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার জ্বালানি উপদেষ্টা ফয়জুল কবির খানের নেওয়া বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। বিগত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে মোড় নেয়।

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ২০১০ সালের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ বা দায়মুক্তি আইন বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও বাস্তবে আগের চুক্তিগুলো বহাল রাখা হয়েছে, কিন্তু সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এসব প্রকল্প বাতিলের পেছনে নীতিগত দ্বৈততার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ৫,২৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও তাতে বিনিয়োগকারীরা সাড়া দেয়নি। রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা বা ‘সভরেন গ্যারান্টি’ না থাকায় মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের জন্য আবেদন জমা পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা বাবদই বকেয়া রয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিল পরিশোধ না করায় সরকার বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। এছাড়া কয়লা ও গ্যাসের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমানে দেশের একাধিক প্রধান বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জ্বালানি খাতের চুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশ নেওয়ার সময় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর করে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, পূর্বের সরকারের আমলে খাতটি নড়বড়ে থাকলেও বর্তমান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনা এটিকে মূলত আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

এই সংকটের মধ্যেই বিভিন্ন কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে আলোচনার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে। তবে জ্বালানি খাতের এই অচলাবস্থা নিরসনে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।