সীতাকুণ্ডের গ্রিন শিপইয়ার্ডে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি: এক যুগে প্রাণ গেল ১৪৮ শ্রমিকের

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ বা পরিবেশবান্ধব কারখানার তকমা থাকলেও বাস্তবে সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক যুগে এই শিল্পের বলি হয়েছেন ১৪৮ জন শ্রমিক এবং আহত হয়েছেন ২৭৯ জন। এর মধ্যে অনেকেই চিরতরে বিকলাঙ্গ হয়ে ধুঁকেধুঁকে মরেছেন নিজ গাঁয়ে। তবে স্থানীয়দের মতে, পরিসংখ্যানের বাহিরে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে জানাজানি হলেও, ছোটখাটো দুর্ঘটনাগুলো ইয়ার্ড মালিকরা গোপনে সমঝোতা করে ধামাচাপা দিয়ে ফেলেন।

একসময় ১৬০টি ছোট-বড় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থাকলেও বর্তমানে ৩১টি সচল শিপইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি শিপইয়ার্ডকে সরকার ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে ছাড়পত্র দিয়েছে এবং ৮টি ইয়ার্ড ছাড়পত্র পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। পরিবেশ সংগঠকদের দাবি, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা কারখানাগুলো কাগজে-কলমে ‘গ্রিন’ ছাড়পত্র অধিকারী হলেও বেশিরভাগ শিপইয়ার্ড অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনিরাপদ পরিবেশে ঝুঁকি নিয়েই সেখানে শ্রমিকরা কাজ করছেন। পরিবেশবিদরা মনে করেন, শুধু গ্রিন তকমা থাকলেই হবে না, প্রত্যেকটি ইয়ার্ডকে ‘বাসেল কনভেনশন’ কার্যকর করতে হবে।

গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’-এ পুরোনো জাহাজের ভেতর বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জাহাজে থাকা একটি ট্যাংকের ভেতর হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জমে থাকার কারণে এই প্রাণহানি ঘটে। তথ্যউপাত্ত বলছে, এলএনজি বহনকারী ‘এমটি রাসি’ জাহাজটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায় এবং ওই মাসেই ভাঙার জন্য উপকূলে আনা হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে ১৪৮ জন নিহতসহ আহত হয়েছেন ২৭৯ জন। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ১৬ জন নিহত, ২০১৬ সালে ১৮ জন নিহত ও ৫ জন আহত, ২০১৭ সালে ১৯ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। ২০১৮ সালে ১৩ জন নিহত ও ৪ জন আহত, ২০১৯ সালে ২৩ জন নিহত ও ৩৪ জন আহত, ২০২০ সালে ১০ জন নিহত ও ২৯ জন আহত, ২০২১ সালে ১৩ জন নিহত ও ৪৩ জন আহত এবং ২০২২ সালে ৭ জন নিহত হন। এছাড়া ২০২৩ সালে ৭ জন নিহত ও ২৮ জন আহত, ২০২৪ সালে ৭ জন নিহত ও ২২ জন আহত এবং ২০২৫ সালে চার জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৯ সালের মে মাসে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) কর্তৃক গৃহীত ‘হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন’ গত বছরের ২৬ জুন থেকে কার্যকর হয়। জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই বৈশ্বিক চুক্তি করা হলেও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) বিশেষজ্ঞ গ্রুপগুলোর দাবি, শুধু হংকং কনভেনশনই যথেষ্ট নয়। ‘গ্রিন ইয়ার্ড’-এ রূপান্তরের পর থেকে আগের দুই বছরের তুলনায় এই শিল্পে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে, যা প্রমাণ করে কারখানাগুলো শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠেনি।

এ বিষয়ে ডিআইএফই চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মাহবুব হোসেন বলেন, গ্রিন ছাড়পত্র পাওয়া অনেক ইয়ার্ডই বাস্তবে নিরাপত্তার নিয়মকানুন মেনে চলে না। যে কারণে গত জুলাই মাসে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।