২০২৪ সালের ৩ আগস্ট, যা ৩৪ জুলাই হিসেবে পরিচিত, রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম বিকেল ৫টার দিকে সর্বস্তরের হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি শেখ হাসিনার সংলাপের আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এর আগে সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, 'গণভবনের দরজা খোলা। আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই ও তাদের কথা শুনতে চাই। আমি কোনো সংঘাত চাই না।'
নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানান, তারা শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, বরং সম্পূর্ণ মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করছেন। এছাড়াও আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া সকল হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের জন্য শেখ হাসিনার বিচারের দাবি জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম জনগণকে দেশব্যাপী 'ছাত্র-জনতার গণ-জাগরণে' অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন যেখানে স্বৈরাচার আর ফিরে আসতে না পারে। তিনি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেন এবং সবাইকে ৪ আগস্ট (৩৫ জুলাই) থেকে পূর্বঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে সমাবেশ শেষ হলে বিক্ষোভকারীরা টিএসসি এলাকায় জড়ো হয়ে রাজু ভাস্কর্যের চোখ লাল কাপড় দিয়ে বেঁধে প্রতিবাদ জানায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করা হয়। আন্দোলনের আরেক প্রধান সমন্বয়কারী আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে ১৫ দফার একটি নির্দেশনা ঘোষণা করেন। এই নির্দেশনার মধ্যে ছিল কর ও ইউটিলিটি বিল প্রদান না করা, সব সরকারি-বেসরকারি অফিস ও কল-কারখানা বন্ধ রাখা, প্রবাসী রেমিট্যান্স বন্ধ করা, গণপরিবহন ও বন্দর কার্যক্রম স্থবির রাখা এবং পুলিশ ও আমলাদের অসহযোগিতা করা।
৩ আগস্ট সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে জাতীয় পতাকা ও ব্যানার নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে জনস্রোত শুরু হয়। জনসমুদ্র দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট এবং শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বিক্ষোভকারীরা 'দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ' স্লোগানে এলাকা মুখরিত করে তোলে। একই সময় বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং মিরপুর-১০ গোলচত্বরে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সমাবেশ করেন।
যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শহরে অবস্থান নিয়েছিল, তবে তারা বিক্ষোভকারীদের খুব একটা বাধা সৃষ্টি করেনি। একই দিনে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণে জনগণের জীবন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিল করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; শিক্ষার্থীরা যাত্রাবাড়ী ও সাভারে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে।
আন্দোলন চলাকালে সিলেট, কুমিল্লা, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের হামলার অভিযোগ ওঠে। গাজীপুরে একজন নিহতের খবর পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবন ও মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। বগুড়ায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে ছয়জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, এই বিক্ষোভ এখন আর ছাত্র আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

