দিনাজপুর সদর উপজেলার পাহাড়পুর রোডের আবদুর রাজ্জাকের ইলেকট্রিক দোকানে এখন কর্মব্যস্ত পরিবেশ। গত ৩০ জুলাই দুপুরে সেখানে দেখা যায়, দোকানে বেশ কয়েকটি পুরোনো ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), কয়েকটি ফ্যান ও একটি ওয়াশিং মেশিন রয়েছে। আবদুর রাজ্জাক নিজে একজন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি হিসেবে এসি ও ফ্রিজ মেরামতের কাজ করছেন এবং তাঁকে সহায়তা করছেন একজন সহকারী। তিন বছর আগেও দিনমজুরি করে তাঁর দৈনিক আয় ছিল মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, তাও প্রতিদিন কাজ মিলত না। বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী এই তরুণের মাসিক আয় লাখ টাকার কাছাকাছি এবং তাঁর দোকানে নিয়মিত ছয়জন কর্মী কাজ করছেন।
আবদুর রাজ্জাকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে আড়াই বছর আগে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ‘রেইজ’ প্রকল্পের আওতায় এসি ও ফ্রিজ মেরামত বিষয়ে ছয় মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। তিনি জানান, ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর অভাবের কারণে পড়াশোনা বন্ধ করে দিনমজুরির কাজ করতে হয়েছিল। প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে জীবনে এক টাকাও জমাতে পারেননি, কিন্তু এখন তিনি অন্যদের প্রয়োজনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ধার দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছেন।
তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও টেকসই কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ২০২২ সাল থেকে পিকেএসএফ ‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট’ (রেইজ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে লক্ষাধিক তরুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, এটি মূলত তিনটি মডেলে কাজ করছে: ওস্তাদ-শাগরেদ মডেলে শিক্ষানবিশি কার্যক্রম, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা। রেইজ প্রকল্পে পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে ৫৩ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়ন করছে এবং ৮৯টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ৬৪টি জেলার ৩৮০টির বেশি উপজেলায় এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
শিক্ষানবিশি কার্যক্রমের আওতায় কম্পিউটার সার্ভিসিং, বৈদ্যুতিক কাজ, ওয়েল্ডিং, অটোমেকানিক, পোশাক তৈরি ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো ২৬টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফান্সিস কিস্কু নামের এক তরুণ রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ ছেড়ে পিকেএসএফের মাধ্যমে ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন ও মেইনটেন্যান্স শিখে এখন একটি ওয়ার্কশপে ১৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন। অন্যদিকে, যশোরের সুমন মজুমদার প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা পেয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে মাসিক বিক্রয় ১ লাখ থেকে আড়াই-তিন লাখ টাকায় উন্নীত করেছেন।
প্রকল্পটিতে নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দিনাজপুরের বয়েতা খাতুন, ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করার পর স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তিনি রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং শিখে এখন ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন। ২০২৫ সালে বয়েতা খাতুন রেইজ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাদের মাসিক আয় ৯ থেকে ২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত হচ্ছে। ২০২২ সালে ২৫ কোটি ডলারের তহবিল নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

