ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা সংযুক্ত আরব আমিরাতের, দুশ্চিন্তায় তেহরান

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। নিজেদের ভূখণ্ডে ইরান দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে—এমন গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে আবুধাবি এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

এর আগে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে আসা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে একটি আমিরাতের জলসীমায় এবং অন্যটি জলসীমার বাইরে পতিত হয়েছে। আবুধাবির ভাষ্যমতে, সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হয়েছিল। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন। তার দাবি, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মধ্যে এটি একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন’ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের জন্য একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। সাবেক মার্কিন জেনারেল ও সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুবাই বর্তমানে চীন ও তুরস্ককেও ছাড়িয়ে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ইরানের বার্ষিক আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনোভাবে আমিরাতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে সরকারি পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারই ছিল আমিরাত থেকে ইরানে রপ্তানি করা পণ্য। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, তামাক ও বাদামের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলো এই বাণিজ্যের বড় অংশ দখল করে আছে।

আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বাইরেও দুবাই ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে সরাসরি পণ্য আমদানি কঠিন হয়ে পড়লে, দুবাইয়ের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে তা পুনরায় ইরানে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও দুবাই একটি প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিশ্লেষক কিমিট মনে করেন, আমিরাতের এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এটি ইরানের অর্থনীতির ওপর সরাসরি বড় ধরনের আঘাত হানবে।

এই পদক্ষেপকে তেহরান ‘প্রায় যুদ্ধ ঘোষণার মতো’ একটি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানের অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা ও চাপ তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।