জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনার দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিদায়ী সভাপতি এনলেনা বেয়ারবককেও তার সফল নেতৃত্বের জন্য আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সেই আন্দোলনে সকল শহীদ ও আহতদের প্রতি আমি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি স্মরণ করতে চাই আমার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা, যারা অতীতে দেশ ও জনগণের পক্ষে এখান থেকে বক্তব্য রেখেছেন। বিশ্ব মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশ তার দৃঢ় অবস্থান অটুট রেখেছে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের দাবি আমাদের চিরস্থায়ী। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের অবদানকে বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি। জাতিসংঘের এই বিশ্ব মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের সামনে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: আ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’—অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশ এ বছর উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণার ৪০তম এবং ডারবেন ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু বিচার এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে ‘কপ ৩১’-এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা করে। গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তেই যা কিছুই ঘটুক প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মানবিক সংকট নিরসনে বাংলাদেশ গত নয় বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। একইসঙ্গে, আগামীর প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও সোশ্যাল মিডিয়ার সুফল যেন প্রতিটি দেশ ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারে, সেজন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এছাড়া বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতায়নের ওপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক ধারা, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা সচেষ্ট। পরিশেষে, রাষ্ট্র কখনো তার নাগরিকদের ক্ষমতাহীন করে শক্তিশালী হতে পারে না—এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ে আন্দোলন সংগ্রামের পথ ধরে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ। মানব সৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে।

