ডেঙ্গু মোকাবিলায় কেবলমাত্র সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শনিবার রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নেয়ার কথা বলেছেন তিনি। তাই শুধু সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা স্কাউট, গার্ল গাইড কিংবা রেড ক্রিসেন্টের সদস্য হও বা না হও, তোমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। সেটা তোমার বাসায় হতে পারে, স্কুলে হতে পারে কিংবা গ্রামের বাড়িতে হতে পারে।
দিনব্যাপী প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের অংশ হিসেবে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও হাসপাতাল ঘুরে দেখেন। সফরের শুরুতে তিনি কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) ও অস্ত্রোপচারকক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগ পর্যবেক্ষণ করার সময় হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি দেখে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় বেঁধে দেন তিনি। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের চিকিৎসাসেবার খোঁজ-খবর নেন।
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সময়ের ডেঙ্গু প্রকোপের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই যে সবচেয়ে কার্যকর উপায়, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, তারা তাদের স্কুল, বাড়ি ও নিজ নিজ পাড়া পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নেবে কি না। শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক সাড়া দিলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, তরুণরা এগিয়ে এলে নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বছরের এ সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। প্রতিবছর ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হন, অনেকের মৃত্যুও হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা প্রায় আড়াই কোটি মানুষের শহর। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে নাগরিকদের সচেতনতা অপরিহার্য। যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা রোধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, শহরের ডাস্টবিন ও রাস্তার গাছ চুরি হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে দুই থেকে আড়াই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করলেও তাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, কেউ নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা ফেললে তাকে সচেতন করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গা থেকে এসব ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছের চারাও চুরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাছ যত বাড়বে, আমরা তত বুক ভরে শ্বাস নিতে পারব। গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ আমার খুব ভালো লাগে। আমরা সবাই মিলে গাছ লাগালে শহরের তাপমাত্রাও কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
সবুজায়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের প্রতি বছর জন্মদিন উপলক্ষে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন। তিনি শৈশবের স্মৃতিচারণা করে বলেন, একসময় ঢাকায় প্রচুর গাছপালা ও খোলা জায়গা ছিল। বর্তমানে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বাড়ছে। বেশি করে গাছ লাগানো হলে বাতাসের বিশুদ্ধতা রক্ষা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তোমার জন্মদিনে, ভাইবোনের জন্মদিনে কিংবা নানা-নানির জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করবে। গাছগুলো যখন বড় হবে, তোমরাও তখন বড় হবে। গাছপালা কমে যাওয়ায় শহরে গরমের অনুভূতিও বেড়েছে।
পরিদর্শনের এক পর্যায়ে মিরপুরে হকারমুক্ত ফুটপাত পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। এ সময় এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি নিজেই তার ফোন নিয়ে সেলফি তুলে দেন।
সবশেষে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে একটি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার জন্য তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বাস করেন, সরকারের পাশাপাশি তরুণদের এই সম্মিলিত সচেতনতাই পারে ঢাকাকে একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে।

