পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে উন্নত চাকরির আশায় রাশিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার বদলে দেশটিতে গিয়ে তাঁর ঠাঁই হয় যুদ্ধের ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন দেশে থাকা ছোট ভাই মো. রনিকে ফোন করে মামুন জানিয়েছিলেন, ‘যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আর দেখা না-ও হতে পারে। দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে।’ এরপর ট্রাভেল পাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।
কথাগুলো বলছিলেন মামুনের বাবা আবদুল মজিদ। তিনি জানান, যুদ্ধে নেওয়ার পর থেকে মামুনের সঙ্গে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে তাঁর সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া আল আমিনকে আবার ফোন করেন রনি। আল আমিন জানান, মামুন আর বেঁচে নেই। যুদ্ধে নিহত মামুনদের মতো এমন আরও অনেকের ভাগ্যই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গত ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মামুনসহ ৩০ জন বাংলাদেশি ভালো বেতনে চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ১৬, ৮ ও ৬ জনের গ্রুপে ভাগ করে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এরপর গ্রামে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় লোকজন এসে জানাজা না পড়ে মোনাজাত করেন। এক বছরের একটি ছেলেশিশুকে নিয়ে মামুনের স্ত্রীর সামনে শুধুই অন্ধকার। কয়েক বছর ধরেই রাশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এরপর ১৮ মে এক কর্মীর পরিবার থেকে ফোন করে দূতাবাসে জানানো হয়, জাবালে নূর ও আর এস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে রাশিয়ায় এসেছে ৩০ জন, যাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়া থেকে ক্ষতিপূরণ নিতে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, উত্তরাধিকারের রাশিয়ায় গিয়ে অন্তত ছয় মাস থাকাসহ বেশ জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, ৩০ জন বাংলাদেশিকে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুনে যুদ্ধে পাঠানো হয়। এর কোনোটি না থাকলেও বোর্ডে আবেদন করতে পারে পরিবার। মৃত কর্মীর বকেয়া থাকলে তা-ও আদায়ের উদ্যোগ নেয় দূতাবাস।
তিন বছরে ৫৪ জনের মৃত্যু
অনুসন্ধান বলছে, গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে তাঁদের অনেকেরই মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে কেউ না ফিরলে তাঁকে নিখোঁজ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এ ধরনের নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন বা কতজন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। ‘শিকার হিসেবে’ যুদ্ধক্ষেত্রে, প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর কথা জানাল এসআরবি।
প্রতারণার ফাঁদ ও এজেন্সির ভূমিকা
এসআরবি, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যাঁদের বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয়েছে, তাঁরা কেউ যুদ্ধের জন্য যোগ্য নন। শারীরিক সক্ষমতা বা সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁদের শিকারে পরিণত করা হয়েছে। চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস ওভারসিজ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে পাঠানো হলেও সেখানে তাঁদের যুদ্ধশিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও সরকারি পদক্ষেপ
রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে যাচাই–বাছাই ছাড়া কর্মী পাঠানো নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছে। গত ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, দুটি এজেন্সি সত্যায়ন করাতে না পারায় টিএস ওভারসিজের নামে কর্মীদের পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত চার–পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের তথ্য রাশিয়ার সরকার দূতাবাসকে জানাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য নিশ্চিত করেছে তারা। তবে এসব এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পাচারের চক্র সক্রিয় রয়ে গেছে। গত ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সি জাবালে নূর গত ৫ মে ৭০ জন কর্মী পাঠানোর অনুমতি চাইলেও সত্যায়ন করেনি দূতাবাস। প্রাথমিকভাবে আর এস ইন্টারন্যাশনালকে ১০ জন কর্মী নিয়ে আসার কথা বলা হলেও সন্দেহ তৈরি হলে তা স্থগিত করা হয়। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে নিয়মিত আলোচনা চলছে। আর রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করছে না, তাই দেশেও পাঠানো যাচ্ছে না। ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি সংগঠন গত মার্চে জানায়, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে সে সময় পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন।
নিখোঁজ স্বজনদের আকুতি
নিখোঁজ স্বজনদের ফিরিয়ে আনতে গত জুলাই মাসে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে ২৮টি চিঠি জমা দেওয়া হয়। এসব চিঠিতে পরিবারের সদস্যরা তাঁদের স্বজনদের উদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানান। রুশ যুদ্ধশিবির থেকে বাংলাদেশি যুবকের করুণ আকুতি ছিল, ‘এই জীবন তো আর চাই নাই।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান না পাওয়ায় পরিবারগুলো দিশেহারা।
আর্থিক অনুদান ও ক্ষতিপূরণের সীমাবদ্ধতা
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেওয়া হয়, তবে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা মরদেহ ছাড়া ক্ষতিপূরণ পাওয়া অসম্ভব। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সনদ না পাওয়ায় পরিবারগুলো সরকারি আর্থিক সহায়তার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। কর্মী যদি দেশ থেকে বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকেন বা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাস থেকে মেম্বারশিপ নিবন্ধন নেন; তাহলে তাঁর মরদেহ আনার খরচ বহন করে কল্যাণ বোর্ড। দেশে আসা প্রতিটি মৃতদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয় কল্যাণ বোর্ড। এরপর ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সতর্কতা
রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের নিয়োগ দেওয়ার খবরটি ইউক্রেনের গোয়েন্দারাও নিশ্চিত করেছে। এছাড়া রাশিয়া মানব পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশি কোম্পানির ওপর যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও উঠে এসেছে। সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত রাশিয়াগামী মানব পাচারের অভিযোগে অন্তত ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অথচ এখনো অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি পুরোনো চাহিদাপত্র ব্যবহার করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
আহতদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চিত্র
যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে দেশে ফেরত আসা দুজন এবং আরও ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই কর্মীরা পরিবারের কাছে বাঁচার জন্য আকুতি জানিয়েছিল। যেমন পলাশ শেখ নামক এক তরুণ যুদ্ধে আহত হয়ে মস্কোর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধে গিয়ে তিনি হাত হারান। এখনো এমন অনেকে মস্কোর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন যাদের পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন। টানা দুই মাস হাসপাতালে কাটানোর পর পালিয়ে দূতাবাসে যান।
শ্রমবাজারের অসংগতি
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়াগামী শ্রমিকের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৩৭ জন ছাড়পত্র নিলেও ২০২৫ সালে তা ৪ হাজার ৭২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলোই সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে। অথচ এদের যথাযথ তদারকি বা নজরদারির অভাব রয়েছে। এদের একজন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন ও আরেকজন ঝিনাইদহের রাজন হোসেন।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ও অনাগত ঝুঁকি
রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী নিজে থেকেই রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। সবশেষ ৩০ জনের বিষয়েও রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা চুক্তির বাইরে গিয়ে সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু দরিদ্র অসহায় মানুষদের পাচারের শিকল থেকে মুক্ত করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবশেষ ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে এখনো কিছু জানায়নি।
তথ্য প্রবাহ ও সীমাবদ্ধতা
যাঁরা প্রতারিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। রাশিয়া বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করে না, ফলে স্বজনরা জানতে পারেন না তাঁদের প্রিয়জন আদৌ জীবিত নাকি মৃত। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দিনই নতুন কোনো দুঃসংবাদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। তাঁদের অনেকেই ১২ ও ১৩ জুনের দিকে মারা যান।

