আজ ২৫ অক্টোবর প্রকৃতিপ্রেমী ও সমাজসেবক মুকিত মজুমদার বাবুর জন্মদিন। ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম মুকিত মজুমদার বাবুর।
১৯৭১ সালে ছাত্রাবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এই ব্যক্তিত্ব দেশ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানোর পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি ১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং পরিবেশ সচেতনতার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন। ১৯৭১ সালে ছাত্রাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই মানুষটির জীবনপথে দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় পাওয়া যায় নানা উদ্যোগে। ইমপ্রেস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে তিনি ব্যবসায়ী জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। অথচ উন্নয়ন ও দৈনন্দিন জীবনের নানা চাপে প্রকৃতি ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা গড়তে শুধু পর্দায় তথ্য তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়। খ্যাতিমান লেখকদের লেখা নিয়ে সম্পাদনা করেছেন ‘প্রকৃতিকথা’।
প্রকৃতি ভালো না থাকলে মানুষের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে—এই সহজ ও গভীর দর্শনকে কেন্দ্র করেই ২০০৯ সালে তিনি ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী বছর ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ে তাঁর জনপ্রিয় ধারাবাহিক তথ্যচিত্র অনুষ্ঠান ‘প্রকৃতি ও জীবন’ প্রচার শুরু হয়। এছাড়া তিনি ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘প্রকৃতিবার্তা’র সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মতৎপরতায় পরিবেশ রক্ষার বার্তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
মুকিত মজুমদার বাবুর উদ্যোগের অন্যতম দিক হলো মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম। তিনি দেশি প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ, পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণ এবং মহাবিপন্ন বাটাগুর বাসকা বা বড় কাইট্টা কাছিমের প্রজনন ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া শকুন রক্ষা এবং শিকারি পাখি সংরক্ষণের মতো জটিল ও সংবেদনশীল কাজেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরিবেশবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক, কর্মশালা ও স্কুলভিত্তিক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে নটর ডেম কলেজে। বন, নদী, জলাভূমি, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনুষ্ঠানটি কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যেন নিজেদের চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সংরক্ষণে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান। বন বিভাগের সঙ্গে ‘সুফল’ কর্মসূচিতেও সহযোগিতা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে প্রকৃতিকে শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্য হিসেবে দেখার বদলে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে বোঝার প্রয়োজনীয়তা।
প্রকৃতি সংরক্ষণের বার্তা শহুরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি ‘প্রকৃতি মেলা’র আয়োজন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক প্রদানের প্রথা চালু করেন। তৃণমূল পর্যায়ের কাজের অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ৫ জুন তিনি প্রকৃতি সংরক্ষণ ক্লাব গঠন করেন, যার শাখা বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলায় বিস্তৃত। এই ক্লাবগুলোর মাধ্যমে ২০২৩ সালের ৫ মে থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘সবুজে সাজাই বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে ১০ লাখেরও বেশি দেশি প্রজাতির গাছ রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে, যা দেশের বনায়ন কার্যক্রমে বড় অবদান রেখেছে। কেউ সেই ভালোবাসা প্রকাশ করেন গাছ লাগিয়ে, কেউ পাখির ডাক শুনে মুগ্ধ হন, কেউবা অবসর কাটান পাহাড়, বন কিংবা নদীর কাছে। তবে তাঁর পরিচিতি ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসার পরিসর ছাড়িয়ে। একুশে বইমেলায় প্রতিবছর প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর প্রকৃতিবিষয়ক বই। ‘আমার অনেক ঋণ আছে’, ‘আমার দেশ আমার প্রকৃতি’, ‘আমার রূপসী বাংলা’, ‘সবুজ আমার ভালোবাসা’, ‘স্বপ্নের প্রকৃতি’, ‘সবুজে সাজাই আমার বাংলাদেশ’ এবং ‘হৃদয়ে সবুজ বাংলা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রকৃতিবিষয়ক তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, প্রজাপতি পার্ক প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় গাছের পরিচিতি ফলক সংযুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে এর কাজের পরিধিতে।
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের কাজের পরিধি কেবল পরিবেশ রক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানুষের মানবিক প্রয়োজনেও তিনি সমান সক্রিয়। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র’ থেকে এখন পর্যন্ত এক লাখ তিন হাজারের বেশি দুস্থ মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়েছেন। এছাড়া দেশের ৩০ জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ও চরাঞ্চলে মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করে ৪৩ হাজারের বেশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও শীতবস্ত্র সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণকে কেবল বিশেষজ্ঞ কিংবা পরিবেশকর্মীদের আলোচনার বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি তিনি।
দারিদ্র্য বিমোচনেও তিনি সৃজনশীল পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। কেবল অনুদান নয়, বরং স্বাবলম্বী করতে অতিদরিদ্র মানুষের হাতে গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি তুলে দেওয়া হয়েছে। করোনাকালীন সংকটে বিভিন্ন জেলায় ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় স্কুলে ফিরিয়ে আনার মতো সামাজিক উদ্যোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু ভালোবাসাকে যখন একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়বদ্ধতায় রূপ দেওয়া হয়, তখন তা ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানুষের কাজে লাগে। মানুষের হাতে এমন উপকরণ পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন, যা থেকে তারা জানতে পারবেন, বুঝতে পারবেন এবং নিজের জীবনেও তার প্রয়োগ করতে পারবেন।
তাঁর ও প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের অর্জনের ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। স্বাধীনতা পুরস্কারের পাশাপাশি তারা জাতীয় পরিবেশ পদক (২০১২ ও ২০১৫), বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন-২০১৩ এবং এইচএসবিসি-দি ডেইলি স্টার ক্লাইমেট অ্যাওয়ার্ড-২০১২ অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের অন্যান্য স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন চাঁদ সুলতানা পুরস্কার, ফোবানা অ্যাওয়ার্ড-২০১৬, বিজনেস এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড-২০১৪, পল্লীমা গ্রিন স্বর্ণপদক-২০১৭ এবং ‘এ ফ্রেন্ড অব নেচার-২০২১’ সম্মাননা।
মুকিত মজুমদার বাবুর কাজের মূল্যায়ন কেবল পদক বা পুরস্কারে নয়, বরং কতজন মানুষ প্রকৃতি সচেতন হলেন এবং কতখানি পরিবেশের উন্নতি সাধিত হলো, তার ওপর ভিত্তি করে তিনি সাফল্যের বিচার করেন। তাঁর এই নিরলস যাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিকে ভালোবাসার পাশাপাশি তাকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করাই প্রকৃত দেশপ্রেম। আজকের এই বিশেষ দিনে দেশ ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর নিবেদিত প্রাণ কাজের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। রাজু আলীম প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা অনেকেরই থাকে। বরং সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন। নতুন প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত, সুস্থ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু।

