গাজীপুরের টঙ্গীতে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহম্মদ (৩০)-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯ অক্টোবর ওই শিক্ষার্থীকে নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পরদিন, ২০ অক্টোবর দুপুরে তিনি শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাদের বাসভবনে যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিটে লাল রঙের একটি ব্যাগ হাতে ওই ভবনে প্রবেশ করেন মোসলেম। ব্যাগের ভেতরে মিষ্টির প্যাকেট ছিল। ব্যক্তিটি হলেন গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদ (৩০)। আজ সোমবার দুপুরে শিশুটির পরিবার যে ভবনে থাকে, সেখানকার ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজ হাতে এসেছে। সোমবার বিকেলে শিশুটির বাবার সঙ্গে কথা হয়। শিশুটির বাবা অভিযোগ করেন, তাঁর সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়েছেন। গতকাল রোববার তাঁর জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল।
ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিচতলায় নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ১২টা ৩৯ মিনিটে তিনি লিফটে ওঠেন। পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তি ভবনের নিচতলায় ঢুকে কথা বলছেন নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে। কিন্তু যে বাসায় যাওয়ার কথা, সেই বাসার দরজা আর খোলা হলো না।
তবে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে না পেরে ১২টা ৪৫ মিনিটে শিশুটির মায়ের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে তিনি একটি বার্তা পাঠান।
বার্তায় তিনি লেখেন, ‘আপু, আপনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে আসছি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হয়ে প্রায় ১০ মিনিট পর ওই ব্যাগ হাতেই তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তিনি নিজ মাদ্রাসায় ফিরে যান। পরে তিনি আবার নিচে নেমে বেরিয়ে যান। সারাক্ষণ একটা আতঙ্কের মধ্যে কাটছে।’।
বর্তমানে অভিযুক্ত এই শিক্ষক কারাবন্দী রয়েছেন। টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ ২১ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করেন। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পর শিশুটির ওপর নিপীড়নের ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেমকে ২১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
নিপীড়নের শিকার শিশুর বাবা অভিযোগ করেছেন, ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তার ভাষ্যমতে, বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো সরিয়ে ফেলতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অভিযুক্তের পক্ষ থেকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্যও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমার এবং আমার পরিবারের মোবাইল নম্বরগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। বলছে, অভিযোগ যেন তুলে নিই। এই সুযোগে আমাদের ফোনে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যেসব ভিডিও আপলোড করা হয়েছে, সেগুলো যেন ফেলে দিই। ‘কিসের চুমু রে’ বলে মাদ্রাসাশিক্ষককে থাপ্পড়ের ভিডিও ভাইরাল, থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান এ বিষয়ে জানান, দুই পক্ষই থানায় মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছে যে তারা একে অপরের দ্বারা হুমকির শিকার হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ থানায় জমা পড়েনি। ওসি আরও বলেন, শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, বিচার চাওয়ার কারণে এখন উল্টো তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ঘটনার পর স্থানীয়রা অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। শিশুটির বাবা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তার এই লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং অপরাধী ও লেবাসধারীদের বিরুদ্ধে। এখন পর্যন্ত পুরো বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। শিশুটির বাবা আরও বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার এই প্রতিবাদ আলেম সমাজের বিরুদ্ধে নয়।

