এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েও আর ফেরা হলো না রাকিবুলের

ছোটবেলা থেকেই ক্লাসে সেরা ফলাফল করা টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদিরআটা গ্রামের তরুণ রাকিবুল ইসলাম। কৃষক খাদেমুল ইসলাম ও জোহুরা বেগম দম্পতির এই সন্তান এবার ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করতে ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় আসেন এবং পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থাকতে শুরু করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফলে জানা যায়, তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে সেই ভালো ফলের আনন্দ পৌঁছায়নি তাঁর পরিবারে, কারণ এর আগেই ঘটে গেছে এক মর্মান্তিক ঘটনা।

পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটার দিকে একটি অজ্ঞাতপরিচয় নম্বর থেকে রাকিবুলের হোয়াটসঅ্যাপে ফোন আসে। মেসের বন্ধু ইসমাইল ও বুলবুলকে বাইরে যাওয়ার কথা বলে বের হন রাকিবুল। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। ওই দিন রাত ১২টা ২৩ মিনিটে বড় ভাই জহিরুল ইসলাম ফোন করলে অন্য এক ব্যক্তি তা ধরে রাকিবুলকে ফিরে পেতে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরিবারের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করে টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবার ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও রাকিবুলকে ফেরত না দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় অপহরণকারীরা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কোচিংয়ের শিট দেওয়ার কথা বলে এক লোক তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করেন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার মানুষও মেনে নিতে পারছেন না মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি।

নিখোঁজ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনার প্রেক্ষাপটে গত ৫ অক্টোবর রাকিবুলের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম ঢাকার কাফরুল থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশ রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। পরে মামুনের তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া গ্রামে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে মাটিতে চাপা দেওয়া একটি কার্টনের ভেতর থেকে রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার জানান, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অভিযুক্ত মামুন পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর রাকিবুলকে ধানমন্ডির একটি বাসায় নিয়ে হত্যা করেন মামুন। পরে মরদেহ কার্টনে ভরে টেপ দিয়ে মুড়িয়ে রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেন। সেখান থেকে বাসে করে রংপুর ও পরে নীলফামারীর ডিমলা যান। পরদিন সকাল ১০টার দিকে কার্টনটি নিয়ে বাড়িতে গিয়ে সুপারিবাগানে রাখেন এবং সন্ধ্যার পর মাটি চাপা দেন। মামুনের জবানবন্দি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এইচএসসি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে রাকিবুলের এই সাফল্য পরিবারের কান্না আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সহপাঠী ও শিক্ষকরাও মর্মান্তিক এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ। রাকিবুলের ভাই জহিরুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ভাই এত বড় সাফল্য অর্জন করা সত্ত্বেও পরিবারে খুশির বদলে শোকের মাতম চলছে; মিষ্টি বিতরণের পরিবর্তে সবাইকে চোখের জল ফেলতে হচ্ছে। শুধু আমরা নই, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ওর সহপাঠীরাও শোকাহত।