সংবিধান সংশোধনে তাড়াহুড়ো না করার তাগিদ বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি না করে ৭২-এর সংবিধানের মূলনীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক বিভাজন ঘুচিয়ে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তাঁরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি ‘মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও সংবিধানপ্রণেতা ড. কামাল হোসেনের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের প্রচার সম্পাদক সানজিদ রহমান। ওই বক্তব্যে বলা হয়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনো চলমান। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যেন কেউ বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, অবাধ নির্বাচন ও প্রকাশের স্বাধীনতা জোরদার করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার তাগিদ দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন আলোচনা সভায় বলেন, সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে, তবে তা যেন কেবল ক্ষমতা জোরদার করার উদ্দেশ্যে না হয়। অতীতে রাজনৈতিক স্বার্থে করা সংবিধান সংশোধন টেকেনি এবং ভবিষ্যতেও টিকবে না। তিনি স্পষ্ট করেন, কেবল ধর্মীয় চিন্তা থেকে সংবিধান পরিবর্তন করা সমীচীন নয়। বিএনপি যেসব বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি জানান, ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করা এবং সরকারের তরফ থেকে সবার গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সুপ্রিম কোর্টকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধের দাবি জানান। শুধু ধর্মীয় চিন্তাভাবনা থেকেও সংবিধান সংশোধন করা উচিত হবে না। সংশোধন যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সে চিন্তাও আছে সরকারের।

সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সাবেক সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ সভায় বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি জুলাই সনদ যেহেতু কোনো গণপরিষদের অনুমোদন পায়নি, তাই এটি মেনে চলার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। যেকোনো বড় পরিবর্তনের আগে নতুন গণপরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি। এ সময় গণভোটের প্রক্রিয়াকে ‘জগাখিচুড়ি’ ও ‘গোঁজামিল’ আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, এটি জাতিকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করার একটি প্রয়াস।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন জোর দিয়ে বলেন, গত ৫০ বছরে আন্তর্জাতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আসা পরিবর্তনের আলোকেই সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে, তবে মূলনীতিগুলো অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। অতীতের সংবিধান প্রণয়নে যাঁদের বক্তব্য বাদ পড়েছিল, তাঁদের কথা শোনাই এখন প্রধান কাজ। তিনি জীবন রক্ষার অধিকার ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ১৯৭১ সালের জাতীয় চার নেতা হত্যা এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের জোর দাবি উত্থাপন করেন।

সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশ এখন মূল আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ধরে রাখতে হলে বারবার বাহাত্তরের সংবিধানেই ফিরে যেতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে যাবে, তাই যেকোনো মূল্যে তাদের রুখে দিতে হবে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারিক চৌধুরী। রেজাউল ইসলাম ও মুরাদ আল হাসানের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাবেক সভাপতি মো. ইয়াহিয়া, বর্তমান সহসভাপতি জগলুল হায়দার আফ্রিক, আলী আজম, আনোয়ারুল হক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমাউন কবির। এ দেশে মৌলবাদী গোষ্ঠী যদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।