তীব্র তাপপ্রবাহে কালিয়াকৈরে তালের শাঁসের চাহিদা তুঙ্গে
প্রচণ্ড দাবদাহে জনজীবন যখন হাঁসফাঁস করছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর খবর আসছে, ঠিক তখনই গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় মৌসুমি ফল তালের শাঁস মানুষের জন্য এক স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। প্রাকৃতিকভাবে শীতলতা প্রদানকারী ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি বর্তমানে ‘প্রাকৃতিক এসি’ এবং ‘গরিবের ওরস্যালাইন’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। চাহিদার চাপ বাড়ায় দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও ক্রেতাদের ভিড় কমছে না, বরং দিন দিন তা আরও বাড়ছে।
সড়কের পাশে তালের মেলা: এক অভূতপূর্ব দৃশ্য
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কালিয়াকৈর-চন্দ্রা-সফিপুর আঞ্চলিক সড়ক, উপজেলা সদরের খাদ্যগুদাম মোড়, হাইটেক সিটি রেলগেট এবং বারইপাড়া মোড় ঘুরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কজুড়ে যেন তালের একটি বিশাল মেলা বসেছে। সড়কের দু’পাশে বাঁশের মাচা, প্লাস্টিকের বালতি এবং ডালায় কাঁচা তাল ও কোষ ছাড়ানো সাদা শাঁস সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। একপাশে সবুজ-বাদামি কাঁচা তাল থোকায় থোকায় ঝুলছে, আর অন্যপাশে স্টিলের ডেকচিতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে রসালো শাঁস। ক্রেতারা অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শাঁস খাচ্ছেন, আবার অনেকে পলিথিনে করে বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। হাজার হাজার শ্রমিকের আনাগোনায় তালের এই দোকানগুলো যেন এক একটি অস্থায়ী ক্যান্টিনের রূপ নিয়েছে।
বিক্রেতাদের মুখে ব্যবসার চিত্র
কালিয়াকৈর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিক্রেতা মজিবুর রহমান তাঁর ব্যবসার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে তিনি রতনপুর, পূর্ব মৌচাক, ফুলবাড়িয়া গ্রামে ঘুরে বেড়ান। গাছের মালিকের সঙ্গে দরদাম করে একটি গাছের সব তাল ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় কিনে আনেন। পাইকারি বাজারে প্রতি চোখ ৫-৬ টাকা এবং খুচরায় প্রতি পিস ১০-২০ টাকায় বিক্রি করেন। একটি ভালো দিনে তিনি ২৫০-৩০০ পিস শাঁস বিক্রি করতে পারেন, যার মাধ্যমে দিনে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা লেনদেন হয়।
একই এলাকার বিক্রেতা সাইদুর রহমান জানান, শুধু তাঁদের তালপাড়াতেই ৫ জন এই কাজ করেন। পুরো কালিয়াকৈরে প্রায় ৪০-৫০ জন এমন মৌসুমি শ্রমিক তালের শাঁস বিক্রির কাজে জড়িত। জুন ও জুলাই মাস এই দুই মাসই তাঁদের আয়ের প্রধান মৌসুম। হাইটেক সিটি, সফিপুর এবং চন্দ্রার শ্রমিকরা কাজের ফাঁকে ১০-২০ টাকার শাঁস কিনে খাচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ক্রেতাদের স্বস্তির কথা
জমিলা বেগম নামে একজন গার্মেন্টস কর্মী বলেন, কারখানায় কাজ করার সময় দুপুরে গরমে তাঁর মাথা ঘুরতো। এখন তিনি টিফিনের টাকা দিয়ে ১০ টাকার শাঁস কিনে খান এবং বাচ্চাদেরও দেন। তিনি আরও জানান, কোল্ড ড্রিংকসের চেয়ে এটি সস্তা এবং পেটও ঠাণ্ডা রাখে।
পুষ্টিবিদদের মতামত: তালের শাঁসের স্বাস্থ্য উপকারিতা
পুষ্টি বিভাগের কর্মকর্তারা তালের শাঁসের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা জানান, তালের শাঁসে প্রায় ৮৭ শতাংশ পানি থাকে এবং এতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি-১, বি-২ ও অল্প ক্যালরি বিদ্যমান। এটি শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং দ্রুত পানিশূন্যতা পূরণ করে। কৃত্রিম কোমল পানীয়র চেয়ে এটি শতভাগ নিরাপদ, কারণ এতে বাড়তি চিনি বা প্রিজারভেটিভ নেই। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী একটি ফল।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিক্রেতারা জানান, গত ২ বছরে তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং তাল পাড়া ও পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তালের শাঁসের দাম কিছুটা বেড়েছে। তাঁদের মতে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। বিক্রেতারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন যে, যদি সড়ক ও খালের পাড়ে তালগাছ রোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়, তাহলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা পাবে ও বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমবে, অন্যদিকে গরিব মানুষের জন্য মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কৃষি কর্মকর্তারাও এই বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। তাঁরা বলছেন, তাল একটি জলবায়ু সহিষ্ণু ফসল যা খরা ও লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই উপকূলীয় এবং দাবদাহপ্রবণ এলাকায় তালগাছ রোপণ বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
উপসংহার
চলমান তীব্র তাপদাহে যখন এসি-ফ্যানও মানুষকে পুরোপুরি স্বস্তি দিতে পারছে না, তখন কালিয়াকৈরের মানুষের কাছে তালের শাঁস যেন এক আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির এই অমূল্য দানকে রক্ষা করতে তালগাছ নিধন বন্ধ করা এবং নতুন করে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ এখনই নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
