ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে বড় পরিবর্তন: ত্রৈমাসিক পদ্ধতি ও অটোমেশন

ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে বড় পরিবর্তন: ত্রৈমাসিক পদ্ধতি ও অটোমেশন

আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে ভ্যাট নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর (ত্রৈমাসিক) রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যার ফলে ব্যবসায়ীদের আর কোনো কাগজপত্র জমা দিতে হবে না। এমনকি অডিটের আওতায় এলেও প্রতিষ্ঠানটিকে নথিপত্র দাখিল করতে হবে না বলে জানা গেছে।

পরিবর্তনের কারণ ও এনবিআর-এর লক্ষ্য

এ বিষয়ে এনবিআর-এর একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা অনেক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে। এনবিআর চায় ব্যবসায়ীরা যেন সহজে ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এই লক্ষ্যেই তিন মাস পরপর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পূর্ববর্তী মাসের রিটার্ন জমা দিতে হয়। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা ও সুদের বিধান রয়েছে। নতুন নিয়মে বছরে মাত্র চারবার ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো হিসাব সংরক্ষণ, রিটার্ন প্রস্তুত এবং সময়মতো জমা দেওয়াকে একটি বড় প্রশাসনিক বোঝা ও জটিলতা হিসেবে দাবি করে আসছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান এটিকে হয়রানি ও বাড়তি খরচ হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এনবিআর-এর প্রধান লক্ষ্য হলো, সকল ব্যবসায়ী যেন ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসেন।

বর্তমান ভ্যাট দাখিল পদ্ধতি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

বর্তমানে বাংলাদেশের ভ্যাট আইন অনুযায়ী, ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএনধারী) প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হয়। কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে মূসক-৯.১ ফরমে এই রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মাসের বিক্রয়, ক্রয়, ভ্যাট পরিশোধ এবং কর সমন্বয়ের তথ্য পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে দাখিল করতে হয়। রিটার্নে করদাতাকে মোট বিক্রয়, করযোগ্য সরবরাহ, ক্রয়, আমদানি, প্রদেয় ভ্যাট, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ভ্যাটের বিস্তারিত হিসাব দিতে হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় একজন ভ্যাট নিবন্ধিত করদাতাকে বছরে ১২ বার রিটার্ন দাখিল করতে হয়। পাশাপাশি নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, মূসক চালান, স্টক রেজিস্টার ও অন্যান্য নথিপত্র সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা, সুদ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি মাসে রিটার্ন প্রস্তুত ও দাখিল করা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। তাই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মাসিকের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক বা তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল।

ভ্যাট অডিট প্রক্রিয়ার সরলীকরণ

আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাটের অডিট প্রক্রিয়াও সহজ করা হচ্ছে। ভ্যাটের ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারের মাধ্যমে যাবতীয় হিসাব রাখলেই এই সুবিধা মিলবে। এর ফলে আগের মতো ম্যানুয়াল অডিট হবে না বলে জানা গেছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য আরও একটি স্বস্তির খবর।

ভ্যাট নিবন্ধনের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএন) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত বিশেষ ভ্যাট নিবন্ধন অভিযানে ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হওয়ার পর ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর আগে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার। আগামী অর্থবছরে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বলে জানা গেছে।