দেশের ব্যাংকিং খাতে ৫ বড় ঝুঁকি, বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের ব্যাংকিং খাতে ৫ বড় ঝুঁকি: অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্বেগ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে পাঁচটি গুরুতর আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অণুবিভাগ কর্তৃক প্রণীত ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি-২০২৬-২৭ হতে ২০২৮-২০২৯’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

মূলধন ও মুনাফার সূচকগুলো উদ্বেগজনক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) মাইনাস (-) ২.৬৪ শতাংশ, খেলাপি ঋণ (এনপিএল) প্রায় ৩০ শতাংশ, সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) মাইনাস (-) ৪.৮১ শতাংশ এবং ইক্যুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) মাইনাস (-) ২৪৩.৯ শতাংশ। এর পাশাপাশি, আয়-ব্যয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৯১ শতাংশে। অর্থ মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, এই সূচকগুলো তীব্র ব্যালেন্স শিট চাপ, দুর্বল মুনাফা এবং সীমিত পরিচালন দক্ষতার ইঙ্গিত দেয়, যা ভবিষ্যতে যেকোনো অভিঘাত সহ্য করার ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতাকে অত্যন্ত সীমিত করে তোলে।

যদিও সামগ্রিক স্তরে তারল্য কাভারেজ রেশিও (লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও) এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও ১০০ শতাংশের ওপরে রয়েছে, যা পর্যাপ্ত তারল্য পরিস্থিতি নির্দেশ করে, তবুও বেশ কয়েকটি একক ব্যাংকে তারল্য সংকট বা চাপ বিদ্যমান। এই একক ব্যাংকের সংকট খাত-ভিত্তিক গড় চিত্রে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভাগ আরও জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আর্থিক ঝুঁকির একটি উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু অংশের সম্পদের গুণগত মান, মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের গুরুতর দুর্বলতাকে তুলে ধরে।

অর্থ বিভাগসংশ্লিষ্ট উইংয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতাগুলো আর্থিক মধ্যস্থতাকে বাধাগ্রস্ত করে, মুদ্রানীতির সঞ্চালনকে দুর্বল করে এবং সরকারি খাতের আকস্মিক সহায়তার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়ে বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল মূলধন ভিত্তি, ক্রমাগত লোকসান এবং অসম তারল্য পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলো সাধারণত নতুন ঋণ প্রদানে কঠোরতা আরোপ করে, উচ্চ ঋণ মার্জিন বা স্প্রেড বজায় রাখে এবং উৎপাদনশীল খাতগুলোতে ঋণের প্রবাহ কমিয়ে দেয়। যদি টেকসই সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে এই অবকাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মধ্যমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংকট মোকাবিলায় করণীয়

এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় অর্থ বিভাগ কিছু সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, তদারকিব্যবস্থা ধারাবাহিক জোরদারকরণ, খেলাপি বা সঙ্কটাপন্ন সম্পদের দ্রুত নিষ্পত্তি, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃমূলধনকরণ ও পুনর্গঠন এবং পুরো ব্যাংকিং খাতজুড়ে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় দক্ষতার উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।

অর্থমন্ত্রীর উদ্বেগ: খেলাপি ঋণ বেড়েছে বহুগুণ

বর্তমান সরকার এই ভঙ্গুর ব্যাংকব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আর্থিকখাতের যে বাস্তব অবস্থা স্পষ্ট হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রভাবনির্ভর ও বেনামি ঋণ প্রদান, অস্বচ্ছতা, পুনঃতফসিলকরণ সুবিধার অপব্যবহার এবং বিধি-বিধানের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করে প্রবণতা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে।”

অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বেড়ে ৩৫.৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর পরিণতিতে অনেক ব্যাংকে তারল্যসংকট দেখা দিয়েছে, আমানতকারীদের আস্থা ক্ষুণœ হয়েছে এবং কিছু কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন অথবা একীভূতকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।