চ্যালেঞ্জে পুলিশ বাহিনী: পোশাক বদল বিলাসিতা?

পুলিশ বাহিনী বর্তমানে তীব্র যানবাহন সংকট, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা এবং আবাসন সমস্যাসহ বহুমুখী কর্মচাপের সম্মুখীন হচ্ছে। আইন প্রয়োগের সময় পুলিশ সদস্যদের প্রায়শই নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে হয়, এমনকি উত্তেজিত জনতার ক্ষোভেরও শিকার হতে হয়। সাইবার অপরাধের মতো জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে দ্রুত পুলিশের পোশাক পরিবর্তনকে সাধারণ মানুষ একটি বিলাসবহুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক সহিংসতায় বাহিনীর শত শত যানবাহন ও থানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। পর্যাপ্ত গাড়ির অভাবে থানা পুলিশের নিয়মিত টহল ব্যাহত হচ্ছে এবং অপরাধ বা জরুরি খবর পাওয়ার পরও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। দুই লাখ তের হাজার পুলিশ সদস্যের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশেরই নিজস্ব আবাসন সুবিধা নেই। অপর্যাপ্ত ব্যারাক বা অস্বাস্থ্যকর আবাসিক পরিবেশে বসবাসের কারণে তাদের জীবনযাত্রার মান ও স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতি আনতে এসব কাঠামোগত, লজিস্টিক ও প্রশাসনিক সমস্যা দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র যানবাহন সংকট, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা এবং আবাসনসহ অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে পোশাক পরিবর্তন করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের চেয়ে তাদের পেশাদারিত্ব, মানবিক আচরণ এবং দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেবল বাহ্যিক পোশাক বা রঙের পরিবর্তন আনলেই জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিতা।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, এটি কি কেবল পুলিশের সংস্কারের অংশ, নাকি এর পেছনে আর্থিক অপচয়, দুর্নীতি অথবা অন্য কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। তাদের মতে, সবার আগে বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শুধু পোশাক বদলালেই পুলিশের আচরণে পরিবর্তন আসবে না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে একের পর এক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় বাহিনীটি ব্যাপক ইমেজ সংকটে পড়ে। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম ইনকিলাবকে বলেন, "পুলিশের পোশাক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পোশাকে একদিকে আরাম এবং অপরদিকে মর্যাদার বিষয়টি জড়িত। সাধারণ পুলিশ সদস্যরা এই পোশাক পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন সময়ে দাবি তুলেছেন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার পুলিশের এই দাবি পূরণ করেছে।" তিনি আরও বলেন, "পুলিশে অনেক সমস্যা রয়েছে। সবগুলো তো একসঙ্গে সমাধান করা যাবে না। আবাসন সমস্যাও পুলিশে বিদ্যমান। যেমন প্রথমত ব্যারাক, দ্বিতীয়ত ফ্যামিলি কোয়ার্টার। সব সদস্যের বাসা ভাড়া দিয়ে থাকার মতো সামর্থ্য নেই। তবে গুরুত্বসহকারে এক এক করে সমস্যার সমাধান করা হবে।"

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে জানান, পুলিশে যেন ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একবার পরিবর্তনের পর আবারও বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্ম বদলে ফেলা হচ্ছে। ইউনূস সরকারের সময় বিপুল অর্থব্যয়ে কেনা পোশাক পরিবর্তন করছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইউনিফর্মের পরিবর্তন এনে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মেট্রোপলিটন এলাকার পুলিশ সদস্যদের ইউনিফর্ম আগের মতো হালকা অলিভ রঙের শার্ট এবং মেট্রোপলিটন ছাড়া অন্যান্য ইউনিটের (সদর দপ্তরসহ) ইউনিফর্ম গাঢ় নীল রঙের শার্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই খাকি রঙের ট্রাউজার বা প্যান্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত জটিলতা, আবাসন সংকট এবং যানবাহনের অভাব—এসব সমস্যা পুলিশবাহিনীকে দুর্বল করে তুলছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানসিক চাপ ও অবসাদ। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাবে অনেক পুলিশ সদস্যই হতাশায় ডুবে যাচ্ছেন, এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। তাদের মতে, কর্মঘণ্টা কমানো, পদোন্নতি সহজ করা, আবাসন ও যানবাহনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ সদস্যদের জীবনমান উন্নত করতে হলে তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে। এতে শুধু পুলিশবাহিনী শক্তিশালী হবে না, সমাজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

রাজারবাগ ব্যারাকে থাকা পুলিশের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তাদের জন্য সীমিত পরিসরের আবাসন রয়েছে, যা স্বাস্থ্যকরও নয়। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি সদস্যকে সেখানে থাকতে হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগের সদস্যদের আবাসনের জন্য দুটি ভবন বরাদ্দ দেওয়া আছে, যেখানে ১ হাজার ৫১ জন থাকতে পারেন। অথচ সেখানে প্রটেকশন বিভাগের ২ হাজার ১২২ জন সদস্য বসবাস করছেন। এর বাইরে পুলিশ সদর দপ্তরের কিছু সদস্যও সেখানে থাকেন। ব্যারাক ভবন দুটিতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি পুলিশ সদস্য গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। এমনকি স্থান সংকুলান না হওয়ায় সিঁড়ির নিচে বিছানা পেতে থাকতে হয়। সেখানেও জায়গা না পেলে অনেককে ভবনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টাঙিয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে। এসব সমস্যার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে পোশাক পরিবর্তন করাকে তারা রহস্যজনক বলে মনে করেন।

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৫ আগস্টের আগে ও পরে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের অনেক ঘটনা ঘটেছে। থানা ও ফাঁড়িসহ একাধিক স্থানে হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র লুটের পাশাপাশি ৪৪ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এখনো লুট হওয়া সব আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। ওই সময় ৫২৬টি সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ৫৩৩টি গাড়ি ভাঙচুর ও অকেজো করে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৫৯টি যানবাহন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।