বিশ্বকাপে অ্যাডিডাস-নাইকির লড়াই: মাঠের বাইরেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের হিসাব নয়, এটি ক্রীড়া ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এক বিশাল বিপণন যুদ্ধক্ষেত্রও। কোন দল কত গোল করল বা কারা নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল, যেমন এসব সংখ্যার খেলা, তেমনি বিপণনের জগতেও ব্র্যান্ডগুলোর বাজারমূল্য ও পণ্য বিক্রির হিসাবই শেষ কথা।

তারকাখচিত বিজ্ঞাপন ও বিপণন ব্যয়

বিশ্বকাপকে ঘিরে অ্যাডিডাস ও নাইকি উভয়ই তাদের সবচেয়ে বড় ও সাহসী বিজ্ঞাপন প্রচারে নেমেছে। নাইকির ‘রিপ দ্য স্ক্রিপ্ট’ বিজ্ঞাপনে কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ড, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লেব্রন জেমসের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে, অ্যাডিডাসের ‘ব্যাকইয়ার্ড লেজেন্ডস’ বিজ্ঞাপনে লামিনে ইয়ামাল, জুড বেলিংহাম, লিওনেল মেসি ও জিনেদিন জিদানের মতো কিংবদন্তিরা রয়েছেন। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ডেভিড বেকহ্যামকেও এই বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে। হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমার মতো দেখতে এসব বিজ্ঞাপন তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মান ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস শুধু বিজ্ঞাপন তৈরিতেই প্রায় ৫ কোটি পাউন্ড খরচ করেছে। যদিও দুই প্রতিষ্ঠানই তাদের ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করেনি, তবে নিশ্চিতভাবেই এই অঙ্ক কয়েক কোটি ডলারের ঘরে।

ইউটিউব ভিউয়ে কে এগিয়ে?

এবারের প্রচারাভিযানে ইউটিউব ভিউয়ের দিক থেকে নাইকি আপাতত এগিয়ে রয়েছে। নাইকির বিজ্ঞাপনটি এখন পর্যন্ত ৭ কোটি ৬০ লাখ বার দেখা হয়েছে, যেখানে অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনটি দেখা হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ বার।

ডিজিটাল যুগে বিপণন কৌশল

নাইকির গ্লোবাল ফুটবলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল ম্যানেজার ক্যামিলো আন্দ্রাদে বলেন, “সংস্কৃতির গতি ও ধরনে পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল যুগে গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, দ্রুত ভেঙে যায় এবং দ্রুত নতুন ব্যাখ্যাও পায়। এর মানে হলো, একসময় একটি পরিপাটি বিজ্ঞাপনই যথেষ্ট ছিল, এখন তা আর নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই প্রচারণার সাফল্য শুধু ভিডিওটি কত মানুষ দেখল, তা দিয়ে পরিমাপ হবে না; বরং আমরা এমন একটি জগৎ তৈরি করতে পারলাম কি না, যেখানে ভক্ত, খেলোয়াড় ও নির্মাতারা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা, পুনর্নির্মাণ ও আরও অগ্রসর হতে পারে—সেটাই মূল বিষয়। যখন এমনটা শুরু হয়, তখন বুঝতে হবে, বিজ্ঞাপন তার সীমা ছাড়িয়ে ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।”

অন্যদিকে, অ্যাডিডাসের সঙ্গে বিশ্বকাপের সম্পর্ক ১৯৭০ সাল থেকে, যখন তারা টুর্নামেন্টের জন্য আইকনিক ‘টেলস্টার’ ম্যাচ বল তৈরি করেছিল। অ্যাডিডাসের ব্র্যান্ড ও পারফরম্যান্স মার্কেটিং কমিউনিকেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্লোরিয়ান অল্ট বলেন, “আমাদের ‘ব্যাকইয়ার্ড লেজেন্ডস’ প্রচারণার একটি দৃশ্য আছে যা ফুটবল খেলেছেন এমন সবার কাছেই পরিচিত—স্থানীয় মাঠ, অপরাজেয় এক দল আর কিছু গল্প, যা পরে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে।” ফ্লোরিয়ান আরও বলেন, “এই প্রচারণার মাধ্যমে আমরা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাই, ঠিক যেখানে তাঁরা আছেন। কেউ টেলিভিশনে খেলা দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় খেলোয়াড়কে অনুসরণ করছেন; আবার কেউ যুক্ত আছেন ফুটবল ঘিরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির সঙ্গে।”

নিউইয়র্কে ব্র্যান্ডিংয়ের লড়াই

বিশ্বকাপের মনোযোগ দখলের লড়াই পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে, এবং প্রথম পর্বে মনে হচ্ছে, নিউইয়র্কে অ্যাডিডাস কিছুটা এগিয়ে আছে। সোহো এলাকায় অ্যাডিডাস ও নাইকির মূল দোকান মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও, অ্যাডিডাসের দোকানটি পুরোপুরি বিশ্বকাপের আবহে ডুবে আছে। সেখানে ফুটবল জার্সি ও টুর্নামেন্ট-সংশ্লিষ্ট পণ্যই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। অন্যদিকে, রাস্তার ওপারে নাইকির প্রধান মনোযোগ এখনো সাম্প্রতিক এনবিএ শিরোপাজয়ী নিউইয়র্ক নিকসের দিকে।

ম্যানহাটানের বিভিন্ন জায়গায় অ্যাডিডাসের ব্র্যান্ডিং আরও বেশি চোখে পড়ে। বিশ্বকাপকে ঘিরে তাদের পপ-আপ স্টোর, ছোট ছোট প্রচারণা স্ট্যান্ড ও শহরজুড়ে বিজ্ঞাপনগুলো বেশ দৃশ্যমান।

মাঠের বাইরের ফুটবল সংস্কৃতি

অ্যাডিডাস মাঠের বাইরের ফুটবল সংস্কৃতিকেও সফলভাবে ধরতে পেরেছে। তাদের সাম্প্রতিক অ্যাওয়ে জার্সিগুলো ফ্যাশন ও স্ট্রিটওয়্যার জগতে, বিশেষ করে তরুণ সমর্থকদের মধ্যে, ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জাপান ও কুরাসাওয়ের জার্সি এখন শুধু দলের পণ্য নয়, পরিচয়ের প্রতীকও হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে অ্যাডিডাস ফুটবল পোশাক ও দৈনন্দিন ফ্যাশনের সীমারেখা অনেকটাই মুছে দিতে পেরেছে। মাঠেও এসব জার্সি নাইকির তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে, যদিও মার্কিন দলটির জার্সি তৈরি করেছে ওরেগনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নাইকি। এটি অবশ্য কেবল প্রাথমিক চিত্র, তবে নাইকির নিজস্ব দেশেই আপাতত মনোযোগের লড়াইয়ে অ্যাডিডাস এগিয়ে আছে।

ঐতিহাসিক বিজ্ঞাপন ও নস্টালজিয়া

বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন বহু বছর ধরেই দর্শকদের বিনোদন জুগিয়েছে এবং ব্র্যান্ডগুলোর আয়ও বাড়িয়েছে। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের বিমানবন্দরের সেই স্মরণীয় বিজ্ঞাপন কিংবা ২০০৬ সালে অ্যাডিডাসের ‘হোসে প্লাস টেন’—যেখানে দুই শিশু প্রিয় ফুটবলারদের নিয়ে স্বপ্নের দল গড়ে—এখনো অনেকের মনে গেঁথে আছে।

ক্রীড়া ব্র্যান্ড-কৌশলবিদ জেমস কার্কহ্যাম বলেন, “এসব বিজ্ঞাপন এখনো সমর্থকদের মনে দাগ কাটে। আমরা অনেকটা হারিয়ে যাওয়া পুরোনো বন্ধুর মতো পুরোনো বিজ্ঞাপনগুলোর কথা বলি। সিনেমা বা টিভি সিরিজের মতো সেগুলো নিয়ে আমাদের নস্টালজিয়া আছে।” অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনে হলিউড অভিনেতা টিমোথি শ্যালামেকে ট্যাক্সি চালাতে দেখা যাওয়া এখন খুবই স্বাভাবিক। ফুটবল হলো মানুষে মানুষে সংযোগের বড় ক্ষেত্র। সংগীতের মতোই এটি মানুষকে যুক্ত করে এবং ঐক্যবদ্ধ করে। এখন সংগীত, ফ্যাশন, বাস্কেটবল, গেমিং ও নকশা—সবই ফুটবলকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন বড় ভূমিকা পালন করছে। কার্কহ্যাম বলেন, “অনেকে বলে টেলিভিশনের যুগ শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টেলিভিশন এখন সর্বত্র। এখন যেন আমাদের হাতে লাখ লাখ ক্ষুদ্র টিভি আছে। ইনস্টাগ্রাম রিলস, ইউটিউব শর্টস, টিকটক—সব মিলিয়ে এখন ক্লিপ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আগে সবকিছুই ছিল সময় ধরে দেখার ওপর নির্ভরশীল। এখন সেটা বদলেছে। এখন কেউ কিছু পাঠিয়ে দিলে হয়তো আপনি তার ছোট একটি অংশই দেখবেন।”

জার্সি ও বুটের স্পনসরশিপ

বিশ্বকাপের জার্সির ক্ষেত্রে অ্যাডিডাস কিছুটা এগিয়ে। এবারের টুর্নামেন্টে তারা ১৪টি দলের জার্সি বানিয়েছে, যেখানে নাইকি করেছে ১২ দলের। পুমা আছে ১১টি দলের সঙ্গে। নিউ ব্যালান্সের মতো অন্য ব্র্যান্ডও রয়েছে। কার্কহ্যাম বলেন, “তরুণ সমর্থকেরা অন্তত চারটি দল অনুসরণ করছেন, বিষয়টি এখন খুবই স্বাভাবিক। তবে তাঁরা মূলত নির্দিষ্ট খেলোয়াড়দেরই অনুসরণ করেন। জার্সি বিক্রিতে সেটাই প্রতিফলিত হয়।”

কার্কহ্যাম আরও বলেন, “ফুটবল ও ফ্যাশন এখন পুরোপুরি একসূত্রে গাঁথা। খেলোয়াড়রা যখন হুগো পরে বের হন, কিংবা জুড বেলিংহাম যখন গুচির সঙ্গে থাকেন—এই মেলবন্ধন এখন সর্বত্র। এটা এখন প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক। এর মূলে আছে ফুটবল জার্সি।”

বুটের (উত্তর আমেরিকায় যাকে জুতা বলা হয়) স্পনসরশিপও দুই ব্র্যান্ডের জন্য ব্যবসার বড় উৎস। শুধু এ দুটিই নয়, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বড় তারকাদের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহী। এর মধ্য দিয়ে শীর্ষ খেলোয়াড়েরা বিপুল পারিশ্রমিক আয় করে থাকেন। গুলমার্গের তথ্য অনুযায়ী, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে নাইকির এক দশকের চুক্তির মূল্য বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

বিশ্বকাপের গুরুত্ব ও চূড়ান্ত লক্ষ্য

অ্যাডিডাসের অল্ট বলেন, “ফিফা বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন। ক্রীড়া ব্র্যান্ডের কাজ হচ্ছে এই টুর্নামেন্টের সময় আমরা সেরা আয়োজনটা করব, সেটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, অ্যাডিডাসের সাফল্য শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়; তৃণমূল থেকে বড় মঞ্চ পর্যন্ত বিভিন্ন খেলায় ক্রীড়াবিদদের সহায়তা করাই তাদের লক্ষ্য।

নাইকির আন্দ্রাদে বলেন, “বড় ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হলে আমরা আবারও বুঝতে পারি, ফুটবল এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ঘটনা। কোটি কোটি মানুষ এতে যুক্ত হয়, যেখানে অন্য ক্ষেত্রগুলোতে সংখ্যা লাখে সীমাবদ্ধ থাকে।” তিনি যোগ করেন, “এ সময় পুরো বিশ্ব যেন থমকে যায়। বৈশ্বিক পরিসর, আবেগের তীব্রতা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিচারে ফুটবল এখনো নিজস্ব জগতে আছে।”

তবে ভুলে গেলে চলবে না, নাইকি ও অ্যাডিডাস—দুই প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত ব্যবসা করে। বাজারের অংশীদারত্ব ও আয়ই তাদের মূল লক্ষ্য। কে সবচেয়ে বেশি ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রি করছে, তার সঠিক হিসাব এখনই বলা সম্ভব নয়। বিজয়ীদের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠার অনেক পরে সেই হিসাব পরিষ্কার হবে। শেষ পর্যন্ত সবকিছুই আবার সংখ্যার মধ্যেই ফিরে আসে।