রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। টাকার অঙ্কে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১ মাসের সর্বোচ্চ আদায়। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আদায় বেড়েছে প্রায় ৩২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা বা ১০.০২ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যানের বিপরীত চিত্র হলো, সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ মাসে প্রায় ৪০ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪১ শতাংশ বেশি।
ঘাটতির ঝুঁকিতে চলতি অর্থবছর
এনবিআর যদি শেষ মাসে ১০ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে, তবুও মোট আদায় ৪ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়াবে। এতে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআর ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী বছরে রাজস্ব আদায় সাড়ে ৪৮ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৫ কোটি টাকার বিপরীতে ১১ মাসে আদায় করেছে মাত্র ৮১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৮১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে।
রাজস্ব আয়ের উৎস ও বৈপরীত্য
১১ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির তিনটি প্রধান উৎস দেখা যায়:
- স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট: ১ লাখ ৪০ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা (১০% প্রবৃদ্ধি)।
- আয়কর ও ভ্রমণ কর: ১ লাখ ২১ হাজার ৭২ কোটি টাকা (১২.৫৪% প্রবৃদ্ধি)।
- আমদানি শুল্ক ও কর: ৯৯ হাজার ৪০২ কোটি টাকা (৭% প্রবৃদ্ধি)।
পরিসংখ্যানের ভেতরে একটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য রয়েছে। সামগ্রিক আমদানি খাতের কর আদায় বাড়লেও ‘কাস্টমস ডিউটি’ বা আমদানি শুল্ক আদায় কমেছে ১০.৩৪ শতাংশ। এটি নির্দেশ করে যে দেশের আমদানি বাণিজ্য এখনো প্রত্যাশিত গতিতে ফেরেনি। মূলত মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চমূল্যের পণ্যের আমদানি এবং ভ্যাট ও সম্পূরক কর বৃদ্ধির কারণে মোট আয়ের চিত্রটি আপাতদৃষ্টিতে বড় মনে হচ্ছে।
অর্থনীতিতে ঝুঁকির প্রভাব
গত এক দশক ধরে প্রতিটি অর্থবছরেই এনবিআর অতি-উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আসছে, যা বছর শেষে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করে। এই ঘাটতি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং ঋণ পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো এই প্রত্যাশিত আয়ের ওপর ভিত্তি করেই সাজানো হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাকে অনেকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখলেও, বর্তমান লক্ষ্যমাত্রার সাথে বাস্তবতার এই বড় ব্যবধান নতুন অর্থবছরের পরিকল্পনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
