সুই-সুতার ফোঁড়ে ছবি এঁকে বিদেশের বাজারে পাবনার তানিয়া

পাটের চট ও কাপড়ের ওপর সুই-সুতার নিখুঁত ফোঁড়ে ফুটে উঠছে ফুল, পাখি, লতাপাতা, গ্রামবাংলার প্রকৃতি এমনকি মোনালিসার প্রতিকৃতির মতো নান্দনিক সব ছবি। এসব রঙিন কাজ ফ্রেমবন্দি করে ওয়ালম্যাট তৈরির পাশাপাশি কুশন কভার, কাপ ম্যাট ও গ্লাস ম্যাটের মতো নানা গৃহস্থালি পণ্য তৈরি করছেন পাবনা শহরের মণ্ডলপাড়া এলাকার তানিয়া আফরোজ। তাঁর এই শৈল্পিক কাজ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বিক্রি হচ্ছে।

নিজের সৃজনশীল কাজের পাশাপাশি তানিয়া এখন গ্রামের শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সংসারের কাজের ফাঁকে এসব নারী এখন বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। তানিয়ার এই সেলাইয়ের নেশা শুরু হয় প্রায় ৪২ বছর আগে, যখন তাঁর বয়স ১০ বছর। ছোটবেলায় কাঁথা সেলাইয়ের আগ্রহ থেকে সেলাই প্রতিযোগিতায় হারার জেদ থেকেই মায়ের কাছে তাঁর হাতেখড়ি। এরপর নিজ চেষ্টায় চটের ব্যাগ ও কাপড়ে নকশা আঁকা আয়ত্ত করেন তিনি।

শিক্ষাজীবন শেষ করে বিয়ে ও দুই সন্তানের জননী হওয়ার পর শিক্ষকতা এবং বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করলেও সুই-সুতার প্রতি ভালোবাসা তিনি ছাড়েননি। করোনা মহামারির সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে শখের এই কাজকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। ২০১৮ সালে আত্মীয়ের কাছে ১০ হাজার টাকায় একটি ছবি বিক্রির টাকা দিয়েই ব্যবসার পুঁজি গড়ে তোলেন তিনি। ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর কাজের প্রচার বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০টি ছবির বড় অর্ডার পান।

কাজের চাপ বাড়লে তিনি পাবনা সদরের দাপুনিয়া, বাঁশের বাদা, আওতাপাড়া ও সাধুপাড়া গ্রামের নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। ২০২০ সালে ঢাকায় তাঁর তৈরি ছবির প্রদর্শনী হলে পণ্যের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক কারণে কিছু সময় বিরতি থাকলেও বর্তমানে তিনি আবার পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন। তাঁর সেলাইঘরে কাজ করা কানিজ ফাতেমা জানান, এই কাজের মাধ্যমে তিনি পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন, যা এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস।

কাজ ও মানভেদে নারীদের দৈনিক ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়। প্রায় ৭৫ রঙের সুতা ও চট ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করে তানিয়া প্রতিটি ছবিতে গ্রামবাংলা, পদ্ম বিল, বৃষ্টিসন্ধ্যা বা পাখিদের গল্পের মতো বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তোলেন। আকারভেদে প্রতিটি ছবি তৈরিতে তিন দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। তানিয়ার ভাষ্যমতে, প্রতিটি ফোঁড় অত্যন্ত ধৈর্যের বিষয়, তাই একে কেবল পণ্য নয়, বরং শিল্পকর্ম হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তানিয়ার স্বামী মো. কামরুজ্জামান এবং মেয়ে ফারিহা জামান তাঁর এই যাত্রায় বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে পাশে আছেন। ভবিষ্যতে দেশে ও বিদেশে আরও প্রদর্শনীর আয়োজন করে এই শিল্পকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে তানিয়ার। পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান তানিয়া আফরোজের এই উদ্যম ও শৈল্পিক দক্ষতার প্রশংসা করে তাঁর কাজকে অনুপ্রেরণামূলক বলে মন্তব্য করেছেন।