জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারে সাইবার হামলা: ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব

গত বছর ব্রিটেনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ভয়াবহ সাইবার হামলা চালানো হয়। হামলার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ সপ্তাহ উৎপাদন বন্ধ রাখার পাশাপাশি পুরো কম্পিউটার ব্যবস্থাও অচল করে ফেলতে হয়। এর প্রভাব শুধু কোম্পানিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্রিটিশ অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি ছিল যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাইবার হামলা, যা দেশের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়।

শুরুর দিকে হামলাটি ঘিরে ছিল রহস্য। সাধারণ র‍্যানসমওয়্যার হামলার মতো কোনো মুক্তিপণ দাবি করা হয়নি। প্রথমে স্ক্যাটার্ড ল্যাপসাসডলার হান্টার্স নামের একটি অখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করে, যাদের মধ্যে ব্রিটেনেরও কয়েকজন হ্যাকার জড়িত ছিল বলে দাবি করা হয়। এতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তারাই হামলার জন্য দায়ী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তদন্তের সঙ্গে জড়িত পাঁচজন ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পেছনে ছিল রুশ হ্যাকারদের একটি দল। এই তদন্ত বেশ সংবেদনশীল বলে তারা নিজেদের নাম প্রকাশে অনীহা জানান। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বেসরকারি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করে দেখেছেন, এই হামলার কৌশল ও উদ্দেশ্য স্ক্যাটার্ড ল্যাপসাসডলার হান্টার্সের পরিচিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তদন্তকারীরা এখনো খতিয়ে দেখছেন, হামলাকারীরা সরাসরি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক বাসভবন থেকে পাওয়া নির্দেশে কাজ করেছিল, নাকি রুশ সরকারের নীরব সমর্থন পেয়েছিল। ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সাইবার হামলাটি হয়। এরপর ওই বছরের অক্টোবরে দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, রাশিয়ার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রুশ হ্যাকারদের হামলা নতুন কিছু নয়, তবে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা এবং এতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ এটি শুধু মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে চালানো হামলা নয়, বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাতের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই হামলার প্রভাব ছিল ব্যাপক। হামলাটির জেরে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্রিটেনের উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এতে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ২০২৬ অর্থবছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। ঘটনাটির প্রতীকী গুরুত্বও ছিল অনেক; রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা জাগুয়ারের গাড়ি ব্যবহার করেন এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীও কয়েক দশক ধরে ল্যান্ড রোভার বহরের ওপর নির্ভরশীল।

মাইক্রোসফট আগে থেকেই ওই রুশ হ্যাকার দলকে নজরদারিতে রেখেছিল এবং হামলার পর তারাই জাগুয়ারকে কারা তাদের নেটওয়ার্কে ঢুকেছিল তা জানায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় এমন একটি নতুন ধরনের র‍্যানসমওয়্যার ব্যবহার করা হয়, যার এনক্রিপশন প্রযুক্তি আগে অনেক সাইবার বিশেষজ্ঞই দেখেননি। একজন বিশেষজ্ঞ এটিকে অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে বর্ণনা করেন। হামলার সময় জাগুয়ার জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘ওয়ার রুম’ গঠন করে। সেখানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি, ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার, পালো অল্টো নেটওয়ার্কস, গুগলের ম্যান্ডিয়ান্ট ইউনিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই একসঙ্গে কাজ করে।

তদন্তে দেখা গেছে, হামলাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। পুরোনো সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে ঢোকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কৌশল রাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীর মধ্যেই বেশি দেখা যায়। মার্কিন সরকারের সাবেক সাইবার নিরাপত্তা ঠিকাদার অ্যালেক্স অরলিন্স বলেন, এই সম্পর্ক অনেকটা ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নিউইয়র্কের কিছু পুলিশ সদস্য ও সংগঠিত অপরাধচক্রের সম্পর্কের মতো। তাঁর ভাষায়, রুশ সরকার সাইবার অপরাধীদের জন্য একধরনের ‘ছাদ’ হিসেবে কাজ করে।

বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড্যান জারভিস হামলার সময় নিরাপত্তামন্ত্রী ছিলেন। তিনি গত এপ্রিলে স্কটল্যান্ডে এক সম্মেলনে বলেন, বৈরী রাষ্ট্রগুলো বুঝে গেছে যে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের ভেতরটা ফাঁপা করে দেওয়া। হামলার আগেই জাগুয়ারের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের ইঙ্গিত ছিল। গত বছরের জুনে ‘রে’ নামে এক জর্ডানীয় হ্যাকার কোম্পানির আইপি ঠিকানাসহ তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু তখন একই নেটওয়ার্কে রুশ হ্যাকাররাও নীরবে অবস্থান করছিল।

২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট হামলার সময় জাগুয়ার নতুন মডেলের গাড়ি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। টাটা গ্রুপের মালিকানাধীন জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার যুক্তরাজ্যে ৩৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে এবং তাদের সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে আরও ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, চীন, ভারত ও স্লোভাকিয়ায় উৎপাদন বন্ধ করতে হয়। পরে ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় কোম্পানিটি প্রায় ২০০ কোটি ডলারের একটি ঋণের সরকারি গ্যারান্টি পায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। গত এপ্রিলে ড্যান জারভিস বলেন, এই সাইবার হামলার ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিস্ময়কর, যা শত শত মুখোশধারী অপরাধীর শোরুম থেকে গাড়ি লুট করার চেয়েও বেশি ধ্বংসাত্মক ছিল।