বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচে মাঠের তীব্র লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল দুই দলের কৌশলগত ও মেধার পার্থক্য। শেষ পর্যন্ত যোগ্যতর দল হিসেবেই লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি ফাইনালে ইউরোপের এক পরাশক্তির মুখোমুখি হবে।

ম্যাচের প্রথমার্ধে প্রচুর ধাক্কাধাক্কি ও শরীরী লড়াই দেখা গেছে। এই সময়ে দুই দলের খেলোয়াড়দের মনে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের স্মৃতি কাজ করছিল বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রেফারি দক্ষতার সঙ্গে ম্যাচটি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রথমার্ধ ছিল মূলত সমান সমান। ইংল্যান্ড লম্বা বলের কৌশল নিয়ে খেলেছে, যেখানে গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড পেছন থেকে লম্বা করে বল দুই ফ্লাঙ্কে ফেলছিলেন। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে অ্যান্থনি গর্ডন ডান প্রান্ত থেকে আসা সার্ভিস থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু গোল করার পর থেকেই ইংল্যান্ড রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে এবং গোল ধরে রাখার চেষ্টা করে।

ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল একজন ভালো ট্যাকটিশিয়ান হওয়া সত্ত্বেও কেন এমন রক্ষণাত্মক কৌশল নেওয়া হলো, তা অনেকের কাছেই বোধগম্য ছিল না। তারা বেশি ডিপে গিয়ে ব্লক করা শুরু করে। আর্জেন্টিনার মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড়সমৃদ্ধ দলের বিপক্ষে এভাবে বেশিক্ষণ টিকে থাকা যায় না। সম্ভবত নিজেদের হাতে মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের অভাবের কারণেই ইংল্যান্ডকে রক্ষণাত্মক হতে হয়েছিল, আর এই রক্ষণাত্মক মানসিকতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে তারা যেন নিজেই আর্জেন্টিনার হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়।

ইংল্যান্ড কোনোভাবেই আর্জেন্টিনার উইং থেকে আসা আক্রমণগুলো আটকাতে পারছিল না। ফ্লাঙ্ক বা উইং বন্ধ করতে না পারা তাদের হারের অন্যতম বড় কারণ ছিল। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, খেলা তত আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। একটি গোল করা ছাড়া ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ আর্জেন্টিনার গোলকিপার মার্তিনেজকে তেমন কোনো পরীক্ষাতেই ফেলতে পারেনি।

পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনা হাল ছাড়েনি। বক্সের বাইরে থেকে এনজো ফার্নান্দেজের অসাধারণ শটে সমতাসূচক গোলটি ছিল মনে রাখার মতো। ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড আগেই কিছুটা বাঁ দিকে সরে গিয়েছিলেন, আর বলটি দারুণভাবে বাঁক খেয়ে জালে জড়ায়, ফলে পিকফোর্ড চেষ্টা করেও বলের নাগাল পাননি।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে খেলেছে। এই আধিপত্যের মূলে ছিল তাদের উইং প্লে। ফুটবলে ফ্লাঙ্ক (উইং) থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণ থেকে প্রচুর গোল আসে এবং আর্জেন্টিনা সেটাই দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। লাওতারো মার্তিনেজের উচ্চতা বেশি না হলেও তিনি ইংল্যান্ডের দুজন লম্বা ডিফেন্ডারের মাঝখান থেকে দুর্দান্তভাবে লাফিয়ে নিখুঁত হেডারে জয়সূচক গোলটি করেন। সাধারণত বল যখন ওভাবে উইং থেকে আসে, তখন ডিফেন্ডার ও গোলকিপারের জন্য বলের ফ্লাইট বোঝা কঠিন হয়ে যায়। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটির আগে বল পোস্টে লেগেছিল।

এই ম্যাচে লিওনেল মেসির ভূমিকা ছিল চতুর। প্রথমার্ধে খুব বেশি বল টাচ না করলেও দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর অবস্থান প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে রাখে। মেসি একদম সাইড লাইনের কাছাকাছি রাইট ফ্লাঙ্কে বেশি অবস্থান করছিলেন, যাতে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ করতে আসতে সময় লাগে। মেসি সেখান থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকেছেন এবং ম্যাচের দুটি গোলই এসেছে তাঁর অ্যাসিস্ট থেকে।

আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শ্রেষ্ঠত্বই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছে, বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে। ৬০-৬৫ মিনিট পর ইংল্যান্ডের ক্লান্তির বিপরীতে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যেন আরও সতেজ ছিল। একটা সময় দেখা গেল ইংল্যান্ড আর দৌড়ে পারছে না, বলের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। তারা যেন বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল কখন ম্যাচটা শেষ হবে।

গত ম্যাচেই আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ সমতা থেকে একদম শেষ মুহূর্তে দুটি গোল করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। নকআউটের সবগুলো ম্যাচই তীব্র লড়াই করে শেষ মুহূর্তের গোলে জেতা আর্জেন্টিনার প্রবল আত্মবিশ্বাসেরই প্রমাণ। ৭৫ মিনিটের পর তারা ১১টি গোল করেছে, যা তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার অন্য নাম।

ইংল্যান্ডের গোলকিপার পিকফোর্ড বক্সের ভেতর একটি হেড আর একটি ফ্লিক সেভসহ দ্বিতীয়ার্ধে কয়েকটি ভালো সেভ করেন। পিকফোর্ড খুব কাছ থেকে বেশ কটি সেভ না করলে ম্যাচের ব্যবধান ৪-১ হতে পারত বলে মনে করেন অনেকে।

ইংল্যান্ডের জন্য এটি ছিল ১৯৬৬ সালের পর দীর্ঘ ৬০ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা কাটানোর একটি ভালো সুযোগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ষণাত্মক কৌশলে গিয়ে এবং আর্জেন্টিনার মেধা, দক্ষতা ও সামর্থ্যের কাছে হেরে তারা সেই সুযোগটি হারাল। অন্যদিকে, টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠে স্কালোনি বলেছেন, ‘আমরা সত্যিই অনন্য’। বর্তমান ফর্ম ও আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হচ্ছে, আর্জেন্টিনাই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে।