প্রেক্ষাপট: প্যারিসে ই-পাসপোর্ট সংকট: ভোগান্তিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা, দূতাবাসের সামনে ভিড়

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ই-পাসপোর্ট সেবা গ্রহণ এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের এই জটিলতা বর্তমানে চরম ভোগান্তির রূপ নিয়েছে। ই-পাসপোর্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা আরডিভি (RDV) পাওয়ার জন্য শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি প্রতিদিন প্যারিসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে ভিড় করছেন। সেবা প্রত্যাশীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ার হতাশা এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তা প্রবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চল থেকে পাসপোর্ট সংক্রান্ত জরুরি সেবা পাওয়ার আশায় প্রবাসীরা প্যারিসে এসে জড়ো হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনলাইনে বারবার চেষ্টা করেও তারা আরডিভি পাচ্ছেন না। কেউ কয়েক সপ্তাহ আবার কেউ কয়েক মাস ধরে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেকের পাসপোর্টের মেয়াদ দ্রুত শেষ হয়ে আসছে, আবার কারও ফরাসি প্রশাসনের সঙ্গে জরুরি কাজ বা অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্য পাসপোর্ট অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ই-পাসপোর্টের আরডিভি পাওয়া এখন অনেক প্রবাসীর কাছে ‘সোনার হরিণ’-এর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আহমেদ জামিল নামে একজন প্রবাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ই-পাসপোর্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া এখন সোনার হরিণ। তিনি জানান, প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করার পর তিনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন, যার তারিখ আরও এক মাস পরে।

এই সংকটের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে ই-পাসপোর্টের আরডিভি পাওয়ার দাবি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসান রকিবুল নামে একজন লিখেছেন, তার জানা মতে অনেকে টাকা দিয়ে আরডিভি নিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, তার পরিবারের একজন সদস্য ১৪০ ইউরো দিয়ে আরডিভি নিয়েছেন। অন্যদিকে সাইফুর রহমান নামে আরেকজন মন্তব্য করেছেন, তার পরিচিত একজন তাকে জানিয়েছেন যে ১০০ ইউরো দিলে আরডিভি পাওয়া যায়। একই মন্তব্যে তিনি পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি থাকারও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

প্রবাসীদের এই পাসপোর্ট জটিলতা ও দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে দূতাবাসের অবস্থান জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, দূতাবাস প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ প্রবাসী দূতাবাসের সামনে এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন এবং ভিড় করছেন, তাদের সবার জন্য একই মুহূর্তে পাসপোর্ট পাওয়া জরুরি—এমনটি মনে হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, যাদের সত্যিকার অর্থে জরুরি প্রয়োজন রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে সেবা দেওয়া গেলে এবং যাদের এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন নেই, তারা পরবর্তীতে সেবা নিলে বর্তমান চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফ্রান্সের অফিস-আদালতে যেভাবে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নেওয়া হয়, দূতাবাসেও যদি সেই শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়, তবে প্রতিদিন প্রায় ২০০ জন পর্যন্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেবার চাহিদা দূতাবাসের সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। দূতাবাস বর্তমানে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবে চাহিদা এতই বেশি যে, এই সংখ্যাও পর্যাপ্ত হচ্ছে না।

দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা জানান, যাদের গুরুত্বপূর্ণভাবে পাসপোর্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রয়োজন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর যাদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন নেই, তাদের পর্যায়ক্রমে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রবাসীদের মতে, এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু সাময়িক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বরং কাঠামোগত পরিবর্তন এবং দূতাবাসের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

আমি প্রায় ৩ মাস অপেক্ষা করে পাইছি, আরও এক মাস পরে।