বিশ্বজুড়ে চরম বিভাজন ও মেরুকরণের আবহে আয়োজিত এই বিশ্বকাপের সমাপ্তি ঘটলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য পরিবেশে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থা এবং নানা ভূরাজনৈতিক জটিলতাকে পেছনে ফেলে ফুটবলের এই জয় যেন এক নীরব অথচ শক্তিশালী বার্তা বহন করছে। ফাইনাল ম্যাচে স্পেনের কৌশলগত ফুটবলের কাছে আর্জেন্টিনা হার মানলেও, শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো তিক্ততা দেখা যায়নি। বরং টানেলে মেসি নিজে এগিয়ে গিয়ে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করেছেন এবং ম্যাচ শেষে লামিন ইয়ামাল মেসির কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে সম্মান জানিয়েছেন, যা বার্সেলোনার দুই প্রজন্মের দুই কিংবদন্তির এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে রইল।
বিশ্বকাপজুড়ে নানা অ-ক্রীড়া ইস্যু আলোচনায় উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত ফুটবলের আলোই সব ছাপিয়ে গেছে। মার্কিন সরকারের বিতর্কিত ভিসানীতি, ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে ঘিরে বিতর্ক কিংবা ইরানের খেলোয়াড়দের প্রতি দুর্ব্যবহারের মতো শিরোনামগুলো সাময়িক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, মাঠের ফুটবলই বারবার মূল মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে মুসলিমবিরোধী স্লোগানের অভিযোগে স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছিল ফিফা। কিন্তু ইয়ামালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সেই বিতর্ককে পেছনে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে নানা তকমা দেয়া হয়। বলা হয় তারা প্রতারক, ফিফার প্রিয়পাত্র, অহংকারী, বর্ণবাদী। ফাইনালে তারা একটি বিতর্কিত লাল কার্ডও দেখে এবং ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে লড়াই শেষ করে।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি একই মাঠে এমন সব দেশগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করায়, যারা অতীতে যুদ্ধে জড়িয়েছিল বা আজও ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবলের বাইরের নানা বিশ্লেষণের মুখোমুখি হয়। অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করা হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ভারে জর্জরিত করা হয়। অথচ ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার সরলতায়। ফুটবলকে তার মতো থাকতে দেয়াই ভালো। শেষ পর্যন্ত এটি কেবল ১১ জন বনাম ১১ জনের একটি খেলা, যেখানে লক্ষ্য একটাই- প্রতিপক্ষকে হারানো। এই বিশ্বকাপে মেসি, রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আরলিং হালান্ডদের মতো শিল্পীরা কোটি ভক্তকে আজীবনের স্মৃতি উপহার দিয়েছেন।
টুর্নামেন্টজুড়ে বেশ কিছু রূপকথার গল্পও নেতিবাচকতাকে সরিয়ে দিয়েছে। ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রে বৈরী আচরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করলেও, তাদের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানবন্দের দুর্দান্ত সেভ যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। শরণার্থী থেকে কানাডার অধিনায়ক হওয়া আলফনসো ডেভিসের গল্প কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ভিসা ফিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে সেখানেও ফুটবল এক আবেগঘন গল্প তৈরি করে। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার মা তার ছেলের বিশ্বকাপ খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে যেতে পারেননি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ১৫ হাজার ডলারের ভিসা ফি তার পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তী চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ড্রয়ের ম্যাচে তার লড়াই ছিল ফুটবলের মানবিক দিকটিরই প্রতিফলন। শেষ পর্যন্ত সব বিতর্ক ও ভূরাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মাঠের খেলাই ছিল এই বিশ্বকাপের আসল জয়ী।

