সার্চ ইঞ্জিনে নিজেদের সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিযোগীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলকে ১০০ কোটি ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় কমিশন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (ডিএমএ) লঙ্ঘনের দায়ে আরোপ করা এই জরিমানাকে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজার আধিপত্য নিয়ন্ত্রণে ইইউর সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের অভিযোগ, সার্চ ইঞ্জিনের বাজারে নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুগল অন্যায্যভাবে তাদের নিজস্ব শপিং, ভ্রমণ, গেমসসহ বিভিন্ন সেবাকে সার্চ ফলাফলে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সেবাগুলো সার্চ ফলাফলে নিচের দিকে চলে গেছে এবং ব্যবহারকারীদের কাছে সেগুলোর দৃশ্যমানতা কমে গেছে। কমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, ডিএমএ-এর আওতায় ‘গেটকিপার’ হিসেবে চিহ্নিত বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের সেবাকে তৃতীয় পক্ষের সেবার তুলনায় বিশেষ সুবিধা দিতে পারবে না। সার্চ র্যাংকিং ও তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন নীতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
গুগলের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, প্লে স্টোরে থাকা অ্যাপ নির্মাতাদের বিকল্প অর্থপ্রদানের (পেমেন্ট) ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের জানাতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অ্যাপ ডেভেলপাররা গুগলের অতিরিক্ত কমিশন এড়িয়ে কম খরচে বিকল্প পদ্ধতিতে সেবা দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের মতে, এসব কার্যক্রম ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্টের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই আইন মূলত বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর বাজারে আধিপত্যের অপব্যবহার রোধ এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রণয়ন করা হয়।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিযোগিতা নীতি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা বলেন, ‘কোনো পণ্য বা সেবা শুধু একটি সার্চ ইঞ্জিন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হওয়ার কারণে নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে উন্নত হওয়ার কারণেই সফল হওয়া উচিত। ডিজিটাল বাজারে ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য ন্যায্যতা, পছন্দের স্বাধীনতা এবং উদ্ভাবন নিশ্চিত করাই ডিএমএ-এর মূল লক্ষ্য।’ কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, গুগলকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে প্রতিষ্ঠানটিকে বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
তবে ইউরোপীয় কমিশনের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আইনি পরামর্শক কেন্ট ওয়াকার বলেন, এই পদক্ষেপ প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তার ভাষায়, ‘এটি ন্যায্য প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; বরং ভালো সেবাকে দুর্বল করার চেষ্টা। নিয়ন্ত্রকদের কাজ হওয়া উচিত পণ্যের মান উন্নত করা, কমিয়ে দেওয়া নয়।’ সম্প্রতি প্রকাশিত গুগলের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোম্পানিটি সর্বশেষ প্রান্তিকে ১১ হাজার ২১০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। সেই হিসাবে ইউরোপীয় কমিশনের ১০০ কোটি ডলারের জরিমানা প্রতিষ্ঠানটির ত্রৈমাসিক মুনাফার এক শতাংশেরও কম।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট এনগ্যাজেট জানিয়েছে, এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত এসেছে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের প্রতিযোগিতা নীতিকে ‘অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। ফলে নতুন এই জরিমানাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য বিরোধের সঙ্গে এই জরিমানার কোনো সম্পর্ক নেই। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে গুগলের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম বড় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। ২০১৮ সালে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গুগলকে ৪৭০ কোটি ডলার জরিমানা করা হয় এবং চলতি মাসের শুরুতে সেই জরিমানার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আপিলেও হেরে যায় প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ২০১৭ সালে অনলাইন শপিং সার্চে একচেটিয়া আধিপত্যের অপব্যবহারের অভিযোগে গুগলকে ২৮০ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়, যা ২০২৪ সালে আপিলের পরও বহাল থাকে।

